রিভিউঃ স্কুইড গেম – টাকার খেলা, নাকি মরণের?

(স্পয়লার অ্যালার্ট…) সেপ্টেম্বর ২০২১ এ নেটফ্লিক্সে মুক্তি পায় কোরিয়ান থ্রিলার সিরিজ স্কুইড গেম। বর্তমান সময়ে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে রয়েছে এই ড্রামা সিরিজ। ২১.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই সিরিজ থেকে নেটফ্লিক্সের আয় হয়েছে ৯০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। তুমুল জনপ্রিয় এই সিরিজের প্রথম সিজনে ছিল ৯ টি পর্ব। ৪৫৬ জন খেলোয়ার নিয়ে একটি গেম শো আয়োজন করে অজ্ঞাত কিছু মানুষ।

জীবন যুদ্ধে পরাজিত এই সব প্লেয়ার এসে জমায়েত হয়েছে এখানে। লক্ষ্য- টাকা। ৪৫৬ নাম্বার খেলোয়াড়ের আছে জুয়ার নেশা। স্ত্রী তাদের মেয়েকে নিয়ে আলাদা হয়ে গেছে। আগামী বছর সৎ বাবার সাথে মেয়েটা পাড়ি জমাবে আমেরিকা। সেং জি হান নামে এই মানুষটির মাও খুব অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন অনেক টাকা।

কাং সি নামের এক মেয়ে ভাইকে নিয়ে পালিয়ে এসেছে কোরিয়ার অন্য প্রান্ত থেকে। মাকে বর্ডারের ওপার থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন অনেক টাকার। নাম্বার ১ যে খেলোয়াড় আছে, সে ব্রেন টিউমারের পেশেন্ট। তার তিনকুলে কেউ নেই। সম্ভবত, সে এখানে এসেছে নিজের ভাগ্যেকে আর একবার চ্যালেঞ্জ করতে। এছাড়া নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে এখানে জমায়েত হয়েছেন এতজন মানুষ। কিন্তু কী হতে যাচ্ছে সামনে কেউ তা জানেনা। 

যদি কেউ খেলা থেকে স্বেচ্ছায় চলে যেতে চায় তার জন্য কোন উপহার নেই, কিন্তু জয়ী হলে আছে কোটি কোটি টাকা। তবে যদি সবাই সম্মিলিত ভাবে খেলা বন্ধ করতে চায়, তখন বন্ধ হবে এই খেলা। 

তাদের এখানে আনা হয়েছিল অজ্ঞান করে চোখ বেঁধে। যখন তাদের চোখ খোলে, ঠিক তখন তাদের পরনে ছিল সবুজ আর সাদার মিশেলে এক পোশাক। পোশাকে অঙ্কিত তাঁদের সিরিয়াল নাম্বার। প্রথমে তাদের একটা খোলা মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। রেড লাইট গ্রিন লাইট নামে এই খেলা দিয়ে তাদের সবগুলো খেলার শুরু হল। একটু এদিক সেদিকের জন্য প্রাণ খোয়াতে হল প্রায় অর্ধেক খেলোয়াড়কে। 

আতঙ্কিত হয়ে পড়ল সবাই। ফিরে গেল নিজের দুনিয়াতে। কিন্তু কি এক অমোঘ টানে ফিরে এল আবার। এর পর একের পর এক, ডালগোনা লজেন্স, টাগ অফ ওয়ার, গ্লাস ব্রিজ, মার্বেল ফাইট, স্কুইড গেমস সহ নানা গেম খেলতে লাগল সবাই।

মার্বেল গেম খেলায়, সেই বৃদ্ধ নিজে ময়দান থেকে সরে গিয়ে জি-হান কে জিতিয়ে দিয়েছিল সে যাত্রা। স্বেচ্ছায় বেঁছে নিলেন মৃত্যুকে। দ্বিতীয় বার যখন তারা ফিরে আসে, তখন স্কুইড গেমসের একজন গার্ডকে মেরে তার জায়গা দখল করে নেয় এক পুলিশ অফিসার। 

কিন্তু কেন? ফ্রন্ট ম্যান এত দিন একা একা খেলা দেখত। কিন্তু আজকে এতজন অতিথি কেন এল? ফ্রন্টম্যানের ও উপরে আছে একজন নেতা কে সে? কী আছে সেই মুখোশের আড়ালে?

এদিকে প্রতিদিন ডাক্তার খেলোয়াড় কোথায় যায়? গার্ড হিসেবে যারা আছে উনারা মানুষ না রোবট? এত যে লাশ পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে রোজ কত বছর ধরে চলে আসছে এই খেলা? কে দিচ্ছে এত টাকা? এত মানুষকে মেরে ফেলারই বা কারণ কি হতে পারে? 

🔥🔥 গুগল নিউজে বাংলাটেক সাইট ফলো করতে এখানে ক্লিক করুন তারপর ফলো করুন 🔥🔥

অনেক রহস্যের উন্মোচন হতে যাচ্ছে সামনে। কিন্তু জি হান কি সহ্য করতে পারবে এত কিছু? এত মৃত্যুর পেছনে কারণ কি? কারো মৃত্যু কারো জন্য আনন্দের কারণ কি? 

হাজার হাজার প্রশ্ন মাথায় নিয়ে এই সিরিজটি দেখতে বসলে শেষপর্যন্ত অনেক উত্তর পাবেন। তবে অনেক উত্তর থেকে যাবে জানার বাইরে। হয়তো সিজন ২ তে পাওয়া যাবে এসব উত্তর। 

স্কুইড গেমসের স্ক্রিপ্ট লেখা শুরু হয় প্রায় ২০০৮ সালের দিকে। হোয়াং ডং নামের এই লেখক এবং পরিচালক এই সিরিজের আইডিয়া পেয়েছেন জাপানিজ মাঙ্গা থেকে। তিনি সেই সময়ে দেনায় ডুবে ছিলেন। বেশিরভাগ সময় ব্যয় করতেন ক্যাফেতে কমিকস বই পড়ে। আর সেই সময় থেকেই তার মাথায় এই সিরিজের ভাবনা চলে আসে। 

স্কুইড গেমসে, “স্কুইড গেম” অথোরিটির যে নাম্বার দেখানো হয়েছে, সেটি খুব সাধারণ একটি নারীর। যার স্কুইড গেমস সিরিজ নিয়ে কোন ধারনা ছিল না। তবে সিরিজটি প্রচারের পরে সাড়া পেয়েছেন তিনি। একের পর এক তাঁর নাম্বারে ফোন আসছে, সবাই চাইছে স্কুইড গেমসে অংশ নেবার জন্য। নেটফ্লিক্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ ঠুকে দিয়েছেন তিনি। তবে নেটফ্লিক্স সর‍্যি বলে নাম্বারের অংশটি ব্লার করে দেয়ার কথা বলেছে। তবে এতক্ষণে তো নাম্বার ছড়িয়ে গেছে। 

👉 স্মার্ট টিভি কেনার আগে যে ৯টি বিষয় জানা জরুরি

যদি বলা হয় সিরিজ কেমন লেগেছে? এক কথায় বলা যায় বেশ ভালো। প্রতিটি মানুষ দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। মেকিং, ভিজুয়াল, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, ডায়ালগসহ প্রতিটি ছোট ছোট জিনিসের দিকে নজর রাখা হয়েছে। এমনকি দেয়ালের আঁকা ছবি থেকে শুরু করে রান্নাঘর, জুয়ার ময়দান থেকে শুরু করে ফেরী, খেলার মাঠ থেকে শুরু করে হাসপাতালের বিছানা প্রতিটা জিনিসের দিকে খেয়াল রাখা হয়েছে। তবে হ্যাঁ, গল্পে বিদেশি অতিথিদের অভিনয় এবং সংলাপ আপনার ভাল নাও লাগতে পারে।

প্রতিটা মানুষ নিজের লাইফে কত সমস্যার সম্মুখীন হয় তাঁর প্রায় অনেকটুকু পরিচালক এবং লেখক বেশ সুনিপণ ভাবে তুলে ধরেছেন। যেমন নাম্বার ১ খেলোয়াড়, ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত, পরিবারের কেউ তাঁর সাথে নেই। একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছেন এই খেলায়। 

নাম্বার ৪৫৬ খেলোয়াড় চান তার মেয়েকে নিজের কাছে রাখতে। ৪৫৬ জন মানুষের ৪৫৬ রকম সমস্যা। যার সব কিছুর সমাধান টাকা, অন্তত সেটাই ফুটে উঠেছে এখানে। টাকা বা সফলতা সেই পাবে যে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে। আর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা মানেই বেঁচে ফেরা। এ এক অদ্ভুত খেলা!

তবে এত রক্ত, এত মৃত্যু আছে এই সিরিজে, এত নৃশংসতা যেটা অনেকেই সহ্য করতে পারবেনা। ৫/৫ দেবার মত না। ৫ এ ৪ দেয়া যাবে। জোর করে কিছুটা দীর্ঘায়িত করা হয়েছে মনে হয়েছে। শেষ অংশে নতুন সিজন আসার একটা ছোট্ট ইঙ্গিত দেয়া আছে।

👉 নেটফ্লিক্স নিয়ে অজানা কিছু তথ্য

এই সিরিজের প্রতিটি চরিত্র শক্তিশালী ছিল হোক সে একজন গার্ড কিংবা জি হানের মেয়ে অথবা মুখোশের আড়ালের মানুষগুলো। যে ময়দানে খেলাগুলো হত, সেটা আসলেই অসাধারন ছিল। সমুদ্রের মাঝে, এক দ্বীপে তৈরি করা এই জায়গাটি অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত। সিসি ক্যামেরা থেকে শুরু করে আধুনিক অস্ত্র, অটোমেটিক দরজা, সবকিছু আছে এই নির্জন দ্বীপে।

সিরিজের অন্যতম পছন্দের জায়গা হল ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। প্রতিটা প্রায় সব ডায়ালগ ছিল বেশ শক্তিশালী। যা সিরিজের মান আরো উপরে তুলে ধরেছে। প্রতিটি চরিত্রে এত নিখুঁত ছিল, মনে হয়েছে বাস্তব কোন ঘটনা ঘটছে। 

আমরা প্রায়শ অনেক ধরনের রিয়েলিটি শো দেখি। দ্য স্কুইড গেম শো কে একদম রিয়েলিটি শো এর আন্ডারেও ফেলা যায়। 

ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ আর বৃত্ত। এই তিনটি আকারের দেখা মিলবে পুরো সিরিজ জুড়ে। এমনকি গার্ডের মুখের মাস্কে আছে এই তিন চিহ্ন, স্কুইড গেমসের নাম ও লেখা আছে এই তিনিটি চিহ্ন দিয়ে। যে কার্ডদিয়ে সবাইকে ডাকা হয়েছিল সেই কার্ডেও ছিল এই তিনটি চিহ্ন। শেষ গেম ছিল স্কুইড গেম। সেই গেমটি অনেকটা আমাদের দেশ এর “কুতকুত” খেলার মত। এই খেলার বোর্ড বা ছক ছিল এই তিনটি চিহ্নের মিশেলেই। 

👉 স্পটিফাই কি ও কীভাবে ব্যবহার করবেন (বিস্তারিত)

অল্প কথায় বললে, টানটান উত্তেজনাপূর্ণ একটা সিরিজ স্কুইড গেম। ৯টা এপিসোড দেখতে গেলে বেশ ভালো একটা সময় কাটবে। তবে দুর্বল চিত্তের মানুষের না দেখাই ভালো। কেননা এত খুন, রক্ত আছে সেটা আসলে অনেকে পছন্দ করবে না। তবে থ্রিলারপ্রেমী মানুষের জন্য বেশ ভালো একটা সিরিজ। পুরো সময় খারাপ কাটবে না আসা করি। মাথায় রেড লাইট গ্রীন লাইটের মিউজিক বাজতে থাকবে, যেন সম্মোহিত করে ফেলবে আপনাকে।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত প্রায় ১৩০ মিলিয়নের বেশি মানুষ দেখেছে এই গেম বেজড থ্রিলার শো। আপনি কি দেখেছেন স্কুইড গেম সিরিজ? কেমন লেগেছে? কমেন্টে জানাতে পারেন সবাইকে! 

সর্বশেষ প্রযুক্তি বিষয়ক তথ্য সরাসরি আপনার ইমেইলে পেতে ফ্রি সাবস্ক্রাইব করুন!

Join 7,069 other subscribers

[★★] প্ৰযুক্তি নিয়ে লেখালেখি করতে চান? এক্ষুণি একটি টেকবাজ একাউন্ট খুলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে পোস্ট করুন! techbaaj.com ভিজিট করে নতুন একাউন্ট তৈরি করুন। হয়ে উঠুন একজন দুর্দান্ত টেকবাজ!

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.