৫জি কি? ৫জি এর সুবিধা কি? বাংলাদেশে ৫জি নেটওয়ার্ক কবে চালু হবে?

দুনিয়ার প্রতিটি জিনিসের মতই মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রযুক্তিরও বিবর্তন ঘটছে। এদের মধ্যে বর্তমানে আলোচিত হচ্ছে ৫জি বা 5G নেটওয়ার্ক। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার হচ্ছে যেগুলো দীর্ঘ গবেষণার পর সাধারণ গ্রাহকদের ব্যবহার উপযোগী করা হচ্ছে।

সেলুলার টেকনোলজি গুলোর নাম হিসেবে বিভিন্ন টেকনিক্যাল টার্ম ব্যবহার করা হলেও সাধারণ গ্রাহকদের বুঝার সুবিধার্থে এগুলোকে বিভিন্ন প্রজন্মে বা জেনারেশনে ভাগ করা হয়েছে। যেমন- দ্বিতীয় প্রজন্মের নেটওয়ার্ক, তৃতীয় প্রজন্মের নেটওয়ার্ক ইত্যাদি। এগুলোকে সহজে আবার ২জি, ৩জি এসব নামেও ডাকা হয়।

সারা পৃথিবীতেই মোবাইল ব্যবহারকারীরা এখন চতুর্থ প্রজন্মের নেটওয়ার্ক বা ৪জি ব্যবহার করছে। বাংলাদেশেও আমরা 4G সুবিধা উপভোগ করতে পারছি। বাংলাদেশে ৪জি চালু হয় ২০১৮ সালে। আশা করা যায় ২০২১ সালেই বাংলাদেশে ৫জি এর অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীরা। 5G যেহেতু আমাদের জন্য নতুন একটি প্রযুক্তি, তাই সবার মধ্যে এর আগ্রহেরও কমতি নেই। চলুন জেনে নিই ৫জি নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এবং 5G এর সুবিধাগুলো।

৫জি কি? – What is 5G?

আগেই যেমনটি বলেছি, ৫জি হলো পঞ্চম প্রজন্মের অর্থাৎ পরবর্তী প্রজন্মের ওয়্যারলেস মোবাইল নেটওয়ার্ক। স্বাভাবিকভাবেই এর গতি ও প্রকৃতি বর্তমানে ব্যবহৃত ৪জি প্রযুক্তির চেয়ে উন্নত হবে। আর সেটা করতে গিয়ে এর অন্যান্য স্পেসিফিকেশনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আমরা এখানে যে ৫ জি নেটওয়ার্ক এর কথা বলছি সেটা হচ্ছে সেলুলার ডিভাইসে ব্যবহৃত ৫জি। এছাড়াও ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক এরও পঞ্চম প্রজন্ম বা ৫জি উদ্ভাবিত হয়েছে যা ইতিমধ্যে ব্যবহার হচ্ছে।

বর্তমানে ৪জি ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক দুটি টেকনোলজি দিয়ে কাজ করে। একটি হলো এলটিই বা লং টার্ম ইভোল্যুশন আর অন্যটি হলো ওয়াইম্যাক্স। মোবাইল বা স্মার্টফোনে আমরা এলটিই টেকনোলজির ৪জি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে থাকি।

একইভাবে 5G প্রযুক্তিরও হয়তো স্পেসিফিকেশনের উপর ভিত্তি করে কোন টেকনিক্যাল নাম দেয়া হবে। ফাইভ জি নেটওয়ার্ক এ ডেটা ট্রান্সফারের জন্য একটি ভিন্ন এনকোডিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। তাছাড়া এর ক্যারিয়ার চ্যানেল ও অনেক প্রশস্ত হবে যেন বেশি ব্যান্ডউইডথ সরবরাহ করতে পারে এবং একই সাথে অনেক বেশি ডিভাইস সংযুক্ত রাখতে পারে।

5G কতটা দ্রুতগতির হবে? ৫জি এর স্পিড কেমন হবে?

সাধারণত সেলুলার নেটওয়ার্ক এর ভালো-মন্দ এর ট্রান্সফার স্পিড এর উপরই অনেকাংশে নির্ভরশীল। এটা ঠিক যে কোন নেটওয়ার্কের তাত্ত্বিক স্পিড এর চেয়ে বাস্তবিক স্পিড অনেক কম হতে পারে। যেমনটি আমরা ৪জি এর ক্ষেত্রে দেখছি। স্পিড এর ব্যাপারটা আবার ডিভাইসের ক্ষমতা ও আপনার অবস্থানের উপরও নির্ভর করে।

সে যাই হোক, গবেষকরা বলেছেন ৫জি নেটওয়ার্ক এর স্পিড হবে ১০ জিবিপিএস বা সেকেন্ডে ১০ গিগাবিট পর্যন্ত। যদিও ফাইভ-জি এর নেটওয়ার্ক ডিজাইনে এর পিক স্পিড ধরা হয়েছে ২০ গিগাবিট।

কিন্তু বাস্তবিক পরীক্ষাগুলোতে অবশ্য এত স্পিড পাওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন মোবাইল ডিভাইসে পরীক্ষাতে ১ থেকে ১.৫ গিগাবিট পর্যন্ত স্পিড পাওয়া গেছে। কিন্তু তার পরেও এটা বর্তমানের ৪জি এর চেয়ে অনেক অনেক বেশি দ্রুতগতিসম্পন্ন। ফাইভ’জি এর গড় গতি হতে পারে ১০০ Mbps এর চেয়ে বেশি।

চলুন, ৫জি যে কতটা দ্রুত গতির হবে সে সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যাক। সহজভাবে বললে, বর্তমানে আপনি ৪জি নেটওয়ার্কে যে ইন্টারনেট স্পিড পান, 5জি এলে তার চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বেশি স্পিড পাবেন। আরও সহজভাবে বললে, ৫ জি নেটওয়ার্কে আপনি ২ ঘণ্টার একটি ভিডিও ১০ সেকেন্ডেরও কম সময়ে ডাউনলোড করতে পারবেন। যেখানে ৪জি তে এই একই ভিডিও ডাউনলোড করতে ৭ মিনিটের মত সময় লাগে।

সেই সাথে ৫ জি এর ল্যাটেন্সিও অনেক কম হবে। ল্যাটেন্সি হলো সার্ভারের সাথে কানেক্ট করার সময়। সাধারণ ভাষায় যাকে আমরা পিং বলে থাকি। এর ফলে অনলাইন গেমিং সহ আরো অনেক প্রক্রিয়া সহজতর হবে। আপনি যদি আমাদের 👉 ইন্টারনেট স্পিড টেস্ট পোস্টটি পড়েন তাহলে পিং, ল্যাটেনসি, ডাউনলোড/আপলোড স্পিড সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে পারবেন।

👉 মোবাইলে বাংলা লেখার সেরা কিবোর্ড অ্যাপ ফ্রি ডাউনলোড করুন

৫জি এর সুবিধাগুলো কি?

৫জি এর বেশি গতির ফলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা বেশ কিছু সুবিধা পাবেন। তবে 5G মানে কিন্তু শুধুমাত্র উচ্চগতির ইন্টারনেট কানেকশনই না। 5G ব্যবহার করে বিশ্বের যোগাযোগ এবং শিল্প ব্যবস্থায় বিশাল পরিবর্তন আসবে। এটা শুধুমাত্র মুভি দেখার জন্যই না, বরং ৫ জি এর জগত আরও অনেক বড়।

দ্রুত ডাউনলোড

এটাই ৫জি এর সবচেয়ে আলোচিত দিক। ডেটা ট্রান্সফার রেট ৪জি এর তুলনায় ৩০-৫০ গুন বেশি হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এর ফলে ইন্টারনেট থেকে কয়েক জিবি সাইজের একটি ফুল এইচডি মুভি হয়তো আপনি কয়েক সেকেন্ডেই ডাউনলোড করতে পারবেন যা ৪জি এর ক্ষেত্রে চিন্তাও করা যায় না। এছাড়া কয়েক গিগাবাইটের সফটওয়্যার আপডেট করতে আগের দিনের মত আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হবেনা।

👉 আনঅফিসিয়াল ফোন যাচাই ও নিবন্ধন করার নিয়ম

বাফারলেস স্ট্রিমিং

বর্তমান যুগ হলো স্ট্রিমিং এর যুগ। একসময় মানুষ শুধু ভিডিও স্ট্রিমিং এর কথা ভাবলেও গুগল এর স্ট্যাডিয়া এর মতো প্লাটফর্ম ভিডিও গেমকেও স্ট্রিমিং এর ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। 5 জি এর ক্ষেত্রে লো ল্যাটেন্সির জন্য ভিডিও গেম খেলার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। তখন আপনার মোবাইল বা পিসিতে ডাউনলোড না করেই হাই-প্রোফাইল সব গেম খেলতে পারবেন। উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন গেমিং পিসি ছাড়াই যেকোনো পিসিতে গেম খেলা যাবে। ক্লাউড কম্পিউটিং এর মাধ্যমে আপনি গেম স্ট্রিম করেই খেলতে পারবেন।

👉 গেম খেলে টাকা আয় করার উপায়

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি

ভার্চুয়াল রিয়েলিটিই হলো ভবিষ্যৎ। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি কিংবা অগমেন্টেড রিয়েলিটির এক্সপেরিয়েন্স নেয়া ৫জির কল্যাণে আরো সহজ হয়ে যাবে। সেই সাথে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহার করে রোবটের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার এর মত কাজগুলো আস্তে আস্তে আরো প্রচলিত হবে। তখন একজন ডাক্তার তার চেম্বারে বসেই রোবোটিক আর্ম ব্যবহার করে দূরের কোনো অপারেশন থিয়েটারে থাকা রোগীর অপারেশন করতে পারবেন। ৫জি এর উচ্চগতি এবং আলট্রা-লো-ল্যাটেন্সি এই সুবিধা করে দিবে।

পাওয়ার এফিশিয়েন্ট

৫জি নেটওয়ার্ক সমর্থিত মোডেম চিপগুলো আগের চেয়ে অনেক পাওয়ার এফিশিয়েন্ট করা হয়েছে। এর ফলে মোবাইল ডিভাইসে ফাইভজি প্রযুক্তিতে নেট ব্যবহার করলে চার্জ অনেক কম খরচ হবে। মোবাইল চার্জ করা নিয়ে আপনার দুশ্চিন্তা এটি অনেকাংশেই কমিয়ে দিবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন ৫G ফোনগুলোর ব্যাটারির চার্জ আরও বেশি দীর্ঘস্থায়ী হবে। অবশ্য নকিয়া ইতোমধ্যেই জানিয়েছে যে 5G নেটওয়ার্ক ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হবে। সময়ের সাথে আমরা আরো ভাল কিছু আশা করতেই পারি!

স্বয়ংক্রিয় গাড়ি

ড্রাইভারবিহীন গাড়ি ইতোমধ্যেই রাস্তায় চলছে। তবে ৫জি এলে এগুলোর প্রসার আরো বাড়বে। ফাইভ জি নেটওয়ার্কের দ্রুত গতি এবং আলট্রা-লো-ল্যাটেন্সির কারণে গাড়িগুলো নিজের/স্থানীয় নেটওয়ার্ক এবং সার্ভারের সাথে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করে আরও নির্ভুলভাবে চালিত হতে পারবে।

👉 ​​আকাশ ডিটিএইচ কি? আকাশ ডিস এর সুবিধা কি?

বাংলাদেশে ৫জি নেটওয়ার্ক কবে চালু হবে?

৫জি কী? ৫জি এর সুবিধা কী? ৫জি নেটওয়ার্ক কবে চালু হবে?

৫জি নেটওয়ার্ক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যেই চালু হয়ে গেছে। বাংলাদেশেও ২০২১ সালের মধ্যে মোবাইল ৫জি চালু হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অনেক মোবাইল ফোন কোম্পানিই ইতোমধ্যে তাদের ৫জি স্মার্টফোন বাজারে ছেড়েছে। তাই এবছর এবং আগামী বছরের মধ্যে ৫জি চালানোর জন্য আশাবাদী হতে পারেন।

৫জি নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

৫জি নেট স্পিড কেমন হবে?

বর্তমান ৪জি নেটওয়ার্কের চেয়ে ৫জি কমপক্ষে দশ গুণ বেশি দ্রুতগতি সম্পন্ন হবে। যদিও এই গতি আপনার এলাকা, ডিভাইস এবং আরও বেশ কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করবে। তবে ৪জি’র চেয়ে অবশ্যই ভালো অভিজ্ঞতা পাবেন ৫জি তে।

৫জি ইন্টারনেট এর খরচ কত হবে?

বর্তমানে ৪জি ইন্টারনেট প্যাকেজের যে মূল্য, ৫জি এলে এই দাম একই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ৫জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করার জন্য যেহেতু মোবাইল কোম্পানিগুলোর বাড়তি বিনিয়োগ দরকার হবে, তাই প্রাথমিকভাবে ডাটা প্যাকেজের দাম কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশি হতে পারে।

আমি কি আমার বর্তমান ফোনে ৫জি ব্যবহার করতে পারব?

আপনার বর্তমান ফোনটি যদি ৫জি সাপোর্টেড না হয় তাহলে পারবেন না। ৫জি এর জন্য ফোনের মধ্যে বিশেষ চিপ বা হার্ডওয়্যার দরকার হয়। আপনার ফোনটির মডেল নম্বর অনুযায়ী ফোনের কাস্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করলে নিশ্চিতভাবে জানতে পারবেন।

৫জি এর জন্য কি আলাদা সিম কার্ড দরকার হবে?

৪জি এর জন্য যেমন অনেকের সিমকার্ড পরিবর্তন করতে হয়েছিল, ঠিক তেমনি ৫জি এর জন্যও কিছু কিছু গ্রাহকের সিম কার্ড পরিবর্তন করতে হবে। এটা নির্ভর করে আপনি আপনার সিম কার্ডটি কখন কিনেছেন বা পরিবর্তন করেছেন। চিন্তার কিছু নেই, এটা ৫জি চালু হলে জানতে পারবেন।

তো, ৫জি নিয়ে আমরা অনেক কিছু জানলাম। ৫ জি নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী? বর্তমান ৪জি নিয়েই বা আপনার অভিজ্ঞতা কেমন? আপনি কি ফোরজি নিয়ে সন্তুষ্ট? কমেন্টের মাধ্যমে জানান আমাদেরকে আর শেয়ার করুন সবার সাথে।

সর্বশেষ প্রযুক্তি বিষয়ক তথ্য সরাসরি আপনার ইমেইলে পেতে ফ্রি সাবস্ক্রাইব করুন!

Join 5,720 other subscribers

[★★] প্ৰযুক্তি নিয়ে লেখালেখি করতে চান? এক্ষুণি একটি টেকবাজ একাউন্ট খুলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে পোস্ট করুন! techbaaj.com ভিজিট করে নতুন একাউন্ট তৈরি করুন। হয়ে উঠুন একজন দুর্দান্ত টেকবাজ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.