একটি লঞ্চ ভ্রমণের গল্প

By -

যেকোনো প্রকার ছুটির আগের দিন ঢাকা থেকে বরিশালগামী লঞ্চের কেবিন পাওয়া নিতান্তই ব্যতিক্রমী ঘটনা। যেহেতু আমি ভাত-ডাল খাওয়া সম্পূর্ণ সাধারণ একজন নাগরিক, তাই কেবিনের পরিবর্তে সোফা’ই ছিল আমার “ফিজিবল অপশন”। ১৫ ডিসেম্বর ট্রিপ অনুযায়ী সহজ ডটকমের মাধ্যমে অনলাইনে নিজে একটা টিকেট বুক করলাম এবং সহকর্মী তৌফিক ভাইয়ের জন্যও আরেকটা টিকেটের ব্যবস্থা করলাম।
যথাসময়ে লঞ্চে গিয়ে দেখি তৌফিক ভাইয়ের সিটে একদল তরুণী বেশ আত্নবিশ্বাস ও আনন্দের সাথে নৌ-ভ্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সিট হাতছাড়া হতে যাচ্ছে দেখে লঞ্চের “কন্ডাকটর” গোছের এক কর্মীকে বলে সেই তরুণীদলকে তাদের সোফার সন্ধান দিয়ে দিলাম। তারাও খুশি, আমরাও খুশি। একদম যাকে বলে ‘উইন-উইন সিচুয়েশন’। প্রায় হারাতে বসা সিট পুনরুদ্ধার করে স্বস্তি অনুভব করলাম।

সর্বশেষ প্রযুক্তি বিষয়ক তথ্য সরাসরি আপনার ইমেইলে পেতে ফ্রি সাবস্ক্রাইব করুন!

Join 1,456 other subscribers

কিন্তু কয়েক মিনিট পরই ঘটনা নতুন দিকে মোড় নিলো। এক ভদ্রলোক তার ছেলেকে নিয়ে এসে তৌফিক ভাইয়ের সিটে অবস্থান নিলেন। তিনিও সোফার টিকেট বুকিং দিয়েছেন, সম্ভবত টিকেট কাউন্টারের ভুলে তার সেই বুকিং সফল হয়নি। এদিকে লঞ্চ ছেড়ে দিয়েছে।

জানুয়ারিতে ক্লাস ফোরে উঠতে যাওয়া বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে শীতের রাতে লঞ্চ ভ্রমণে এসে এরকম পরিস্থিতি মোটেই সুখকর নয়। ভদ্রলোক বেশ বিচলিত হয়ে পড়লেন। বিভিন্ন জায়গায় ফোন করেও টিকেট বুকিংয়ের রহস্যের কোনো কিনারা করতে পারলেন না। টিকেট চেকারও কোনো ফাঁকা সিট বের করতে ব্যর্থ হলেন।

আমরা ভদ্রলোককে বললাম, “আংকেল টেনশন করবেন না, অন্য কোথাও সিট পাওয়া না গেলে আমরা আপনাকে এই সিটটা ছেড়ে দেব”। তিনি বললেন, “কিন্তু এক সোফায় আপনারা দুইজন যেতে পারবেন? আপনাদের তো কষ্ট হবে।” আমরা বললাম, “সমস্যা নেই, ৫-৬ ঘণ্টার ব্যাপারই তো”।

ভদ্রলোক আশ্বস্ত হলেন। সন্ধ্যায় তিনি যথাসম্ভব ‘ফরমাল’ভাবে সোফায় এসে আসন নিয়েছিলেন। কিন্তু টিকেট জটিলতায় বেশ খানিকটা হয়রানির সম্মুখীন হয়ে ঘর্মাক্ত হওয়ার জোগাড় হলো। শেষপর্যন্ত টিকেট চেকার কোনো ব্যবস্থা করতে না পারায় আমরা একটা সোফা ছেড়ে দিলাম।

লঞ্চের সোফা এরিয়ায় বিশাল এক ফ্লাস্ক ভরা চা আছে। কিন্তু কোনো কাপ অবশিষ্ট নেই। কেবিন বয়ের কাছে চা চাইতেই সে সাফ জানিয়ে দিল- কাপ না থাকায় চা দেয়া সম্ভব না। আমি বললাম তাহলে এখানে যে পানি খাওয়ার গ্লাস আছে তাতে চা দাও। আমার কথা শুনে কেবিন বয় যেনো মহাশূন্য থেকে মাটিতে পড়ল। এমন অনুভব হল, যে গ্লাসে চা খাওয়া চূড়ান্ত লজ্জাকর একটি ব্যাপার।

যাইহোক, মেঘনা নদীর বুকে লঞ্চে ভাসতে ভাসতে ‘কইয়ের তেলে কই ভাজা’ প্রবাদের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে কেবিন বয় চা দিয়েই গ্লাস ধুয়ে সেই গ্লাসে আমাকে চা দিল। আমি লম্বা একটা গ্লাসে দুধ-চা’র মধ্যে কেক ভিজিয়ে খাচ্ছিলাম। ‘সোসাইটি’তে চায়ের মধ্যে বিস্কুট ভিজিয়ে খাওয়াটা কিছুটা ‘লেস-স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে দেখা হয়। সেই হিসেবে এভাবে কেক খাওয়াটাও কিছুটা স্ট্যান্ডার্ডের বরখেলাপ বটে। থ্রি থেকে ফোরে উঠতে যাওয়া ছেলেটা কিছুটা বিস্ময়যুক্ত দৃষ্টিতে আমার ‘চায়ে কেক ভিজিয়ে খাওয়া’ দেখছে। কাছাকাছি কেউ আমার দিকে তাকালে আমি তা বুঝতে পারি। তার চোখ ঘুমে বন্ধ হয়ে আসছে।

আমি বললাম, “এই যে বাবু, চিপস খাবে?” বম্বে সুইটসের আস্ত তিন প্যাকেট মিস্টার টুইস্ট চিপস আমার হাতে ছিল। ওর বাবা বললেন ‘একটু আগেই আমরা ভাত খেয়েছি’।

চলতি পথে অপরিচিত কারও দেয়া কিছু খাওয়া মোটেই ঠিক না।

আমি ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলাম “তোমরা কি ঢাকাতেই থাকো?”

“জি”

“কোন ক্লাসে পড়ো?”

“ক্লাস থ্রি। থ্রি থেকে ফোরে উঠব”

“কোন স্কুল?”

(সে স্কুলের নাম বলল)

“ভাল। তোমার বাবা কী করেন?”

“ব্যাংকে জব করেন।”

“কোন ব্যাংক?”

(সে ব্যাংকের নাম বলল)

“বরিশালে কি তোমার মামাবাড়ি?”

“জি”

বরিশালে তার মামাবাড়ি কিনা তা আমি অনুমান করে নিয়েছিলাম। সে আমার প্রশ্নের ধরন দেখে কিছুটা ফান অনুভব করল বলে মনে হল।

তারা পিতা-পুত্র এখন ঘুমানোর আয়োজনে ব্যস্ত। ওদিকে আরেকদল যাত্রী মেঝেতে তোশক বিছিয়ে বিছানা পাতছেন। ব্যাংকার আংকেল বললেন, “মেঝেতেও ঘুমানো যেতো, ফ্ল্যাট বিছানা”।

লঞ্চের ডেকে যাওয়ার যাদের অভ্যাস ও প্রস্তুতি আছে তাদের কথা ভিন্ন। সেই জার্নি মোটেই “থ্রিলিং” নয়। অপ্রত্যাশিতভাবে একজন বাবা তার সন্তানকে নিয়ে শীতের মধ্যে মেঝেতে কষ্ট করবেন আর আমরা কানে হেডফোন লাগিয়ে মেসেঞ্জারে চ্যাট করতে থাকব, তা তো হতে পারেনা। আমরা সঠিক সিদ্ধান্তই নিলাম।

তৌফিক ভাই আমার সোফার অর্ধেকটাতে ঘুমিয়ে পড়েছেন। তিনি আমার জন্য জায়গা রেখে দিয়েছেন। আমি তাকে বললাম, “আপনি ঘুমিয়ে নিন, আমি মোবাইলে পিডিএফ বই পড়ে রাত পার করে দেবো। তিনিও এরকম এটেম্পট নিলেন, কিন্তু শীঘ্রই ঘুমিয়ে পড়লেন। মিনিট পনেরো বসে বসে ঘুমিয়েছি, সেই অভিজ্ঞতা বেশি ভাল না। এরপর বাকী এক প্যাকেট চিপস খেতে খেতে দেখলাম ভোর হয়ে গেছে।

এতক্ষণ ঘুমন্ত যাত্রীদের নাক-ডাকার শব্দে লঞ্চের ইঞ্জিনের আওয়াজ ঢাকা পড়েছিল। একে মানুষের নিকট যন্ত্রের অনাকাঙ্ক্ষিত পরাজয় বলা চলে। যন্ত্র আবারো তার হারানো গৌরব ফিরে পাচ্ছে (লোকজন ঘুম থেকে উঠতে শুরু করেছে)।

তৌফিক ভাইকে ঘুম থেকে ডেকে তোলার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। ইতোমধ্যে পাশের সিটের পিতা-পুত্র ব্রাশ, পেস্ট নিয়ে দিনের কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছেন। সূর্য উঠি উঠি করছে। লঞ্চ বরিশালে এসে গেছে। কীর্তনখোলার বুকে নিত্যজীবনের কর্মযজ্ঞের সূচনা হয়েছে।

প্রযুক্তির সব তথ্য জানতে ভিজিট করুন www.banglatech24.com সাইট। নতুন পোস্টের নোটিফিকেশন ইমেইলে পেতে এই লিংকে গিয়ে ফ্রি সাবস্ক্রাইব করুন!

 

Comments

Leave a Reply