আমার বন্ধুরা

By -

(পর্ব – ১) 

একজন মানুষের ‘সবচেয়ে ভাল বন্ধু’ কতজন হতে পারে? এমআইটি’র গবেষণা বলছে, একজন মানুষ একই সময়ে মাত্র ৫ জন ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’পেতে পারে। তবে পুরো লাইফটাইমে এই সংখ্যা হেরফের হয়। এখন পর্যন্ত আমার ‘সবচেয়ে কাছের বন্ধু’দের তালিকা চিন্তা করে দেখিনি। তবে সেরকম কোনো লিস্ট করলে যে দুটি নাম অবশ্যই আসবে তা হচ্ছে ‘সবুজ’ এবং ‘মামুন’। ওদের সাথে হাই স্কুল থেকে পরিচয়। স্কুল শেষে বাড়ি ফেরার পথে একত্রে আসতাম আমরা। তখন কে জানত, এদের নিয়ে একদিন ‘রচনা’ লিখতে হবে!

ওদের সাথে পরিচয় হওয়ার আগে আমার স্কুল থেকে বেশিরভাগ সময় একা বাড়ি ফিরতে হত। সময়গুলো একঘেঁয়ে ছিল। প্রথম প্রথম ওরা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। দলে ৪-৫ জন ছিল তারা। একদিন লক্ষ্য করলাম, স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময়টা ভালই কাটছে। ওদের সাথে আমার ঘড়ির সময় মিলিয়ে নিলাম।

সবুজ সময়ের ব্যাপারে খুব সচেতন। স্কুল থেকে শুরু করে এপর্যন্ত মাত্র একবার (তাও সম্প্রতি) সে পূর্বনির্ধারিত সময়ে মিট করতে পারেনি ;)। সুতরাং তার পারফেকশনের ব্যাপারে প্রশংসা করতেই হয়! আমার এসএসসি পরীক্ষার রুটিন সুন্দর হাতের লেখায় লিখে উপহার দিয়েছিল ও। তখন তো এত কম্পিউটার কম্পোজ ছিলনা!

মানুষজন বন্ধুদের বাড়ি বেড়াতে যায়, তারা আসে, অনেকে আবার একই ডিজাইনের পোশাক পরে- এগুলোর কোনোটিই আমার করা হয়নি। তারপরও ওরা আমার কাছের মানুষদের তালিকাভুক্ত। তারা উভয়েই ভীষণ হাসিখুশি ও যত্নবান।

মামুন অত্যন্ত পরোপকারী একজন মানুষ। বন্ধুদের মধ্যে একজন ক্লাসের মধ্যে ফিক করে হেসে ফেলল, অমনি স্যার হয়ত বেত নিয়ে হাজির হলেন। বন্ধুর হয়ে নিজে স্যারের বকুনি শোনা ও মাঝে মাঝে অন্যকে বাঁচাতে স্বেচ্ছায় বেত খাওয়ার রেকর্ডও আছে মামুনের।

সবুজ ও মামুনের হেয়ারস্টাইল আলাদা ছিল। ওরা ডানদিকে ‘সিঁথি’ করত (চুল আঁচড়াত)। ব্যাপারটা আমার বেশ ভাল লাগত। কিন্তু আমার চুলে বড়জোর বামদিকে সিঁথি করতে পারতাম (ইনফ্যাক্ট সিঁথি হতই না সহজে)। হঠাৎ একদিন লক্ষ্য করলাম মামুনের চোখ লাল, মন খারাপ। মনে হচ্ছে কেঁদে ফেলবে। জানতে পারলাম, ডানদিকে চুল আঁচড়ানোর কারণে একজন স্যার মামুনকে বকা দিয়েছেন। তার ওপর সেখানে জুনিয়র মেয়েরাও ছিল। প্রেস্টিজ ইস্যু! ক্লাস টেন এ পড়ি তখন। মনে হল বন্ধুর জন্য আমার কিছু করা উচিৎ। পরের দিন আমিও তেল-পানির সাহায্য নিয়ে ডানদিকে সিঁথি করে স্কুলে গেলাম। সেই স্যার আমাকে বললেন “তুমি কি আজ পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠালে?”। আমি বললাম “স্যার, এখন থেকে পশ্চিম দিক থেকেই সূর্য উঠবে।” ক্লাসের ফার্স্ট বয় ছিলাম বলে স্যার আমাকে আর কিছু বললেন না। তিনি বুঝে নিলেন, এটা ছিল আগের দিনের ঘটনার রেশ। যদিও বিষয়টা হয়ত এতটা সিরিয়াস ছিলনা।

এরপর থেকে আমি ডানদিকেই সিঁথি করি। এটা আমারও ভালই লাগে। এজন্য সেই স্যার এবং মামুনকে ধন্যবাদ দিতেই হয়! স্যার আমাদের সবাইকে অবশ্যই অনেক স্নেহ করতেন। তবে সব বিষয়ে সবার মত নাও তো মিলতে পারে! ভেরি সিম্পল!

দেখতে দেখতে এসএসসি পরীক্ষা চলে এলো। ফেয়ারওয়েলের দিন মোটামুটি সবারই চোখ ছলছল করছিল। অথচ আমার কেন যেন আর পাঁচটা দিনের মতই লাগছিল। অনেকে খুব কান্নাকাটি করল। আমি বুঝতে পারছিলাম, আমারও একটু মন খারাপ থাকা উচিৎ। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল সব। এমনকি একটা বক্তৃতাও দিয়ে ফেললাম মঞ্চে গিয়ে। সবাই মিলে ছবি তুললাম বেশ কিছু। এসএসসি পরীক্ষা উপলক্ষ্যে যে নতুন জামাটা কিনেছিলাম, সেটা পরেই গিয়েছিলাম ফেয়ারওয়েলে। প্রোগ্রাম শেষে সবাই বাড়ি ফিরে গেল।

কিন্তু বাড়ি আসার পর আমার মনে হতে লাগল, এর পর থেকে আর সবাই একসাথে প্রাইভেট পড়া, ক্লাস/কোচিং করা হবেনা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে আসছে, আর আমার মনে এই চিন্তাটাই দানা বাঁধছে। সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগল পরের দিন সকালে। কারণ, আমার নিয়মিত রুটিনে তখন স্কুলে যাওয়ার কথা, কিন্তু আমি বাড়িতে বসে টেস্ট পেপারস সলিউশন করছি। যেসব পোশাক পরে স্কুলে যেতাম, সেগুলোর দিকে তাকাতেও কষ্ট হচ্ছিল। আম্মু আমার ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি হঠাৎ বললেন, ‘ক্লাস শেষ হয়েছে তাতে কী? সোমবার ও শুক্রবার বাজারে তো সবাই আসবে, তখন সবার সাথে দেখা করে আসবি’। আমি সোম ও শুক্রবার হাটবারের অপেক্ষা করতে লাগলাম।

একসময় এসএসসি পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। সবাই বিভিন্ন দিকে চলে গেলাম। সবার সাথে নিয়মিত কথা হয়না, তবে আমার সবার কথাই মনে আছে। অন্যরা যতটা মনে রেখেছে, তার চেয়ে বেশিই মনে আছে।

সবুজ ও মামুন সম্প্রতি বিয়ে করেছে। উভয়েই আমাকে বলেছে “দোয়া করিস ভাই”। আমি এমনিতেও দোয়া করতাম, সেই ছাত্রজীবন থেকেই করে এসেছি! আল্লাহ্ তোদের মঙ্গল করুন! পুরো পরিবার নিয়ে সুখে রাখুন <3

সময়ের সাথে প্রত্যেকেরই নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হয়। কিন্তু এক একজনের স্মৃতি এক একভাবে থেকে যায়। বন্ধুদের কেউ কেউ আমাকে বলে “আমাদেরকে ভুলে গেছিস, ফোন করিস না, নতুন বন্ধুবান্ধব পেয়েছিস তাইনা?”

আমি ওদেরকে কীভাবে বোঝাই যে, একজন মানুষ কখনো আরেকজনের বিকল্প হয়না, বন্ধুত্বে কোনো মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ থাকেনা!

Comments

Leave a Reply