থেরানোসঃ প্রযুক্তি বিশ্বে প্রতারণার এক অবিশ্বাস্য দৃষ্টান্ত!

থেরানোস এলিজাবেথ হোমস

গল্পটা অন্যরকমও হতে পারত। ৯ বছরের ছোট্ট মেয়ে এলিজাবেথ হোমস একদিন তার বাবাকে চিঠি লিখল, সে এমন কিছু আবিষ্কার করবে যা পৃথিবীর কেউ কোনোদিন ভাবেনি যে করা সম্ভব। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পাঠ শেষে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন এলিজাবেথ হোমস। কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রী হোমস শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে এক বছর পড়ার পর ২য় বর্ষে উঠে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিলেন। তিনি তার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সিলিকন ভ্যালির বিখ্যাত “ড্রপআউট”-এর খাতায় নাম লেখালেন। ১৯ বছর বয়সে প্রতিষ্ঠা করলেন থেরানোস নামের স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় ড্রপআউট, স্মার্ট, শিক্ষিতা তরুণী এলিজাবেথ তার মেডিকেল টেকনোলজি স্টার্টআপ নিয়ে তাক লাগিয়ে দিলেন পুরো বিশ্বকে।

২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত থেরানোসের প্রাথমিক প্রাতিষ্ঠানিক মূল্য ছিল ৩০ মিলিয়ন ডলার, যা ২০১৪ সালে ৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। একের পর এক ম্যাগাজিন ও পত্রপত্রিকায় শিরোনাম হন এলিজাবেথ হোমস। তাকে বলা হত “পরবর্তী স্টিভ জবস”। থেরানোস দিয়ে প্রত্যাশার পারদ এতটাই উঁচুতে তুলেছিলেন এলিজাবেথ। কিন্তু একটা সমস্যা হয়েই গেল। যা এলিজাবেথ হোমস এবং থেরানোসকে আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে আনল। কী হয়েছিল? পোস্টের বাকী অংশে থাকছে সেই কাহিনী।

সর্বশেষ প্রযুক্তি বিষয়ক তথ্য সরাসরি আপনার ইমেইলে পেতে ফ্রি সাবস্ক্রাইব করুন!

Join 2,638 other subscribers

যে থেরানোস নিয়ে এত কিছু ঘটল, সেটি একটি মেডিকেল টেস্ট/ডায়াগনস্টিক কোম্পানি। থেরানোস এবং এর প্রতিষ্ঠাতা-সিইও এলিজাবেথ হোমস শুরু থেকেই বলছিলেন যে তাদের নিজস্ব ডিভাইসের মাধ্যমে মানুষের আঙুল থেকে মাত্র কয়েক ফোঁটা রক্ত নিয়েই কয়েক কয়েক হাজার মেডিকেল টেস্ট করা সম্ভব। এতে খরচও হবে খুব কম, যা চিকিৎসা ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। কোম্পানির নাম ও বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য এলিজাবেথ তখন খুব কৌশলে বিভিন্ন প্রকার বক্তব্যে তিল’কে তাল হিসেবে উপস্থাপন করেন। বড় বড় ব্যক্তির সাথে মিটিং করেন।

থেরানোস ডিভাইস

এলিজাবেথ দাবী করেন, তাদের ব্লাড-টেস্টিং মেশিন বাজারের অন্যান্য ব্লাড-ডায়াগনস্টিক মেশিনের অন্তত ৯০ শতাংশ কাজ করতে পারে, আর এতে মাত্র কয়েক ফোঁটা রক্তই যথেষ্ট। কিন্তু আসলে যা ঘটত, থেরানোসের মেশিন খুব সীমিত কিছু টেস্ট করতে পারত। কোম্পানিটি বাজারে বিদ্যমান স্ট্যান্ডার্ড মেশিন মডিফাই করে সেগুলো দিয়ে রক্ত পরীক্ষা করত, আর বাইরে বলত যে এগুলো থেরানোসের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি গোপন মেশিনে করা হয়েছে। এরকম একের পর এক অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার অর্থ সংগ্রহ করেছে থেরানোস। বিনিয়োগকারীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তা হজমও করেছে কোম্পানিটি।

এখানেই শেষ নয়। থেরানোস স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সাথেও নিজেদের মিথ্যা সুসম্পর্কের কথা বলে বেড়াত। কোম্পানিটি দাবী করেছিল, থেরানোসের প্রযুক্তি ব্যবহার করে যুদ্ধক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ব্লাড-টেস্ট করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। যদিও এই দাবীটি যত বড় আকারে করা হত, আসলে ততটা ব্যাপক পরিসরে ব্যবহৃত হতনা থেরানসের ডিভাইস।

এরকম চলতে চলতে একসময় থেরানোস মেশিনের রিপোর্ট ভুল বলেও প্রমাণিত হয়েছিল। এরপর কোম্পানিটি সেই টেস্টগুলো পুনরায় করতে বাধ্য হয়। তাদের ‘এডিসন’ নামের ডিভাইস দ্বারা সম্পন্ন হাজার হাজার টেস্টের সংশোধন প্রকাশ করে থেরানোস। তারা প্রায় দুই বছরের টেস্ট রেজাল্ট ভুল বলে ঘোষণা দেয়।

থেরানোস এলিজাবেথ হোমস

২০১৪ সালে থেরানোস জানায় প্রতিষ্ঠানটি সে বছর ১০৮ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে, কিন্তু পরবর্তীতে প্রকাশ পায় যে, তাদের প্রকৃত আয় ছিল মাত্র ১ লাখ ডলার। এমনকি এটি বিভিন্ন হাই প্রোফাইল ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের জাল প্রশংসাবাক্যও প্রচার করেছিল বলে পত্রপত্রিকায় উঠে আসে।

কোম্পানিটি আরও প্রচার করে, ২০১৫ সালে তাদের আয় (রেভিনিউ) হবে সম্ভাব্য ১ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু সরকারী হিসেবে এই প্রত্যাশিত আয়ের পরিমাণ সম্ভব ছিলনা। ২০১৫ সালেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে থেরানোসের সকল জারিজুরি ফাঁস করে দেয়। এই ক’বছরে অনেকেই হয়ত থেরানোসের কাহিনী ভুলতে বসেছিল।

কিন্তু ঐ যে কথায় বলে, “ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতে”। যুক্তরাষ্ট্রের সিক্যুরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) গত সপ্তাহে থেরানোস, কোম্পানির সিইও এবং প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে একটি বিশাল রিপোর্ট প্রকাশ করে, যাতে এলিজাবেথ হোমসকে ৭০০ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয় প্রতারণার দায়ে

থেরানোস এলিজাবেথ হোমস

এসইসি জানায়, এলিজাবেথ হোমস এবং তার কোম্পানি থেরানোস বহুকাল ধরে মিথ্যে তথ্য দিয়ে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছে। এই প্রতারণার দায়ে এলিজাবেথ হোমসকে ৭০০ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়। এলিজাবেথ এরপর এসইসির সাথে সমঝোতায় আসেন। এতে তিনি ৫ লাখ ডলার জরিমানা দিতে রাজি হয়ে পার পান, কিন্তু শর্ত থাকে যে, থেরানোস কোম্পানিতে থাকা তার ১৮.৯ মিলিয়ন শেয়ার ছেড়ে দেবেন হোমস। সেই সাথে শাস্তিস্বরূপ, আগামী ১০ বছর এলিজাবেথ হোমস কোনো পাবলিক কোম্পানির অফিসার কিংবা ডিরেক্টর হতে পারবেন না। পরবর্তীতে এলিজাবেথের বিরুদ্ধে আরও আইনী ব্যবস্থা আসতে পারে।

কোম্পানি হিসেবে থেরানোস এখনও টিকে আছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, তারা তাদের প্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এলিজাবেথ হোমস, যিনি স্বাস্থ্য-প্রযুক্তিতে বিপ্লব এনে দেয়ার কথা বলে অবাস্তব ডিভাইসের মুলা ঝুলিয়ে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নারী বিলিয়নিয়ার হয়েছিলেন, তার মোট সম্পদের পরিমাণ এখন শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে। থেরানোস কোম্পানি দেউলিয়া হতে হতেও হয়নি, কোনোমতে বেঁচে আছে। ২০১৭ সালে এটি ২২০ জন কর্মী ছাঁটাই করার ঘোষণা দিয়েছিল, যা এর মোট কর্মীসংখ্যার ৪১ শতাংশ।

এখন এলিজাবেথ হোমস এবং তার থেরানোস পরিচিত শুধুমাত্র তাদের নজিরবিহীন কেলেঙ্কারির কারণে। এলিজাবেথ হোমসের হয়ত স্বপ্ন ছিল মেডিকেল টেস্টে বিপ্লব এনে দেয়ার, কিন্তু ছোট্ট এলিজাবেথের সেই স্বপ্নের ধারেকাছেও যেতে পারেননি তিনি ও তার প্রতিষ্ঠান। বরং, চমৎকার-দর্শন এই তরুণী যেন এখন হতাশার অপর নাম হয়ে উঠেছেন, যার মেধা, বাচনভঙ্গি ও বৃহৎ চিন্তা প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। “প্রতারণা” শব্দটি তার নামের সাথে উচ্চারিত হচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক। তবে আমরা অবশ্যই চাইব এলিজাবেথের স্বপ্ন পূরণ হোক, যদিও সেই চাওয়া আপাতদৃষ্টিতে আকাশকুসুম কল্পনাই মনে হচ্ছে।

থেরানোস ঘটনা থেকে আমরা কী শিখতে পারি?

আমাদের ফেসবুক পেইজ লাইক করে সাথে থাকুন!

     
প্রযুক্তির সব তথ্য জানতে ভিজিট করুন www.banglatech24.com সাইট। নতুন পোস্টের নোটিফিকেশন ইমেইলে পেতে এই লিংকে গিয়ে ফ্রি সাবস্ক্রাইব করুন!

Comments