বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে সম্প্রতি সিম নিবন্ধন নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এমন একটি ধারণা যে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একটি জাতীয় পরিচয়পত্র বা NID ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ৫টি সিম রাখা যাবে। এই তথ্যকে কেন্দ্র করে অনেক মানুষই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কেউ ভাবছিলেন হঠাৎ করে অতিরিক্ত সিম বন্ধ হয়ে যাবে, কেউ আবার আগেভাগেই অপ্রয়োজনীয় নম্বর বাতিল করার কথা চিন্তা করছিলেন।
মাত্র কিছুদিন আগেই, ৩০ অক্টোবর ২০২৫ এর মধ্যে একটি এনআইডি-তে সর্বোচ্চ সিম সংখ্যা ১৫ থেকে কমিয়ে ১০ এ নামিয়ে আনা কার্যকর করা হয়। তখন অনেকেই বাড়তি সিম বন্ধ করেন এবং অন্যকে মালিকানা স্থানান্তর করে দিয়ে দেন। এর দুই মাসের মধ্যে আবারও সিম সংখ্যা অর্ধেকে কমিয়ে আনার আলাপ শুনে গ্রাহকরা স্বাভাবিকভাবেই চিন্তিত হয়ে পড়েন।
এই বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির মাঝেই স্বস্তির খবর নিয়ে সামনে আসে টেলিটক। রাষ্ট্রায়ত্ত এই মোবাইল অপারেটর তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক ঘোষণায় স্পষ্ট করে জানায়, বাংলাদেশ সরকারের প্রযোজ্য নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী কোনো নতুন নির্দেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত একটি জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ১০টি সিম নিবন্ধন ও ব্যবহার করা যাবে। অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সিমের সংখ্যা কমে ৫টিতে নেমে আসার কোনো সিদ্ধান্ত এখনো কার্যকর হয়নি।
২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি নিয়ে কেন এত আলোচনা?
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঘুরেফিরে আসছিলঃ ১ জানুয়ারি ২০২৬। অনেক পোস্ট ও মন্তব্যে দাবি করা হচ্ছিল, ওই দিন থেকেই নাকি সরকার নতুন নিয়ম চালু করবে এবং একটি NID দিয়ে সর্বোচ্চ ৫টি সিম ব্যবহারের অনুমতি দেবে। বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছিল যেন এটি নিশ্চিত ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
বাস্তবে এই দাবির পেছনে কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন বা অপারেটরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। তবুও তারিখসহ এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষ সেটিকে সত্য বলেই ধরে নেয়। ফলে আতঙ্ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে যাদের নামে আগে থেকেই ৫টির বেশি সিম নিবন্ধিত রয়েছে।

🔥🔥 গুগল নিউজে বাংলাটেক সাইট ফলো করতে এখানে ক্লিক করুন তারপর ফলো করুন 🔥🔥
৫টি সিমের তথ্য এল কোথা থেকে?
বাংলাদেশে সিম নিবন্ধন নীতিমালা নতুন কিছু নয়। বিগত বছরগুলোতে একাধিকবার বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, পুনঃযাচাই এবং সীমা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কখনো নিরাপত্তার স্বার্থে সীমা কমানোর প্রস্তাব এসেছে, কখনো আবার নতুন কাঠামোর কথা শোনা গেছে। এসব পুরোনো আলোচনা ও প্রস্তাবের কিছু অংশ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খবরে রূপ নেয়।
অনেক সময় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা কিছু কিছু পত্রিকায় “নিশ্চিত সিদ্ধান্ত” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৫টি সিমের সীমা, এই ধারণাটিও মূলত সেই ধরনেরই একটি ব্যাপার, যা যাচাই ছাড়াই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
টেলিটকের ঘোষণায় কী বলা হয়েছে?
এই পরিস্থিতিতে টেলিটকের ফেসবুক পোস্টটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বলা হয়, “বাংলাদেশ সরকারের প্রযোজ্য নির্দেশনা অনুযায়ী, পরবর্তী কোনো নতুন নির্দেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত একটি জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ১০ (দশ)টি সিম নিবন্ধন ও ব্যবহার করা যাবে।”
এই ঘোষণার মাধ্যমে দুটি বিষয় পরিষ্কার হয়। প্রথমত, বর্তমানে ১০টি সিমের সীমা এখনো কার্যকর রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সীমা কমে যাওয়ার বিষয়ে কোনো নতুন নির্দেশনা এখনো জারি হয়নি।
👉 NID’তে সর্বোচ্চ কয়টি সিম? অতিরিক্ত সিম বন্ধ করবে বিটিআরসি
কেন মানুষ এতটা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল?
বর্তমান সময়ে মোবাইল নম্বর শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ব্যবসা, রাইড শেয়ারিং, ফ্রিল্যান্সিং, সবকিছুতেই মোবাইল নম্বর জড়িত। অনেক মানুষ তাই ব্যক্তিগত ও পেশাগত কারণে একাধিক সিম ব্যবহার করেন।
হঠাৎ করে যদি সিম ব্যবহারের সীমা অর্ধেকে নেমে আসে, এই আশঙ্কা থেকেই মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি হয়। কেউ ভাবছিলেন ব্যাংক বা বিকাশ নম্বর বন্ধ হয়ে যাবে, কেউ আবার অফিসিয়াল যোগাযোগ নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান। এই বাস্তব প্রয়োজনগুলোর কারণেই ছড়িয়ে পড়া গুজব মানুষের মনে দ্রুত প্রভাব ফেলেছিল।
১০টি সিম মানে কি শুধু টেলিটক?
অনেকের মনেই প্রশ্ন আসে, টেলিটক ১০টি সিমের কথা বললেও অন্য অপারেটরের ক্ষেত্রে কি আলাদা নিয়ম? বাস্তবে বাংলাদেশে একটি NID-এর বিপরীতে সব মোবাইল অপারেটর মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১০টি সিম ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ টেলিটক, গ্রামীণফোন, রবি বা বাংলালিংকঃ সব মিলিয়েই এই সংখ্যা গণনা করা হয়।
এটি এমন নয় যে প্রতিটি অপারেটরে আলাদা করে ১০টি সিম রাখা যাবে। এই ভুল ধারণাটিও অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি করে।
সরকারি নির্দেশনা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
টেলিটক তাদের পোস্টে বারবার “বাংলাদেশ সরকারের প্রযোজ্য নির্দেশনা”-র কথা উল্লেখ করেছে। এর মানে হলো, অপারেটর নিজেরা আলাদাভাবে এই সীমা ঠিক করে না। সরকার ও টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনার ভিত্তিতেই সিম নিবন্ধনের নিয়ম নির্ধারিত হয়।
তাই কোনো পরিবর্তন আসলে সেটি অবশ্যই সরকারি প্রজ্ঞাপন বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে জানানো হবে। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া সবসময় নিরাপদ নয়।
নিজের নামে কয়টি সিম আছে তা জানার উপায়
এই গুজবের ঘটনায় আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে। অনেক মানুষই নিশ্চিত নন তাদের নামে কয়টি সিম নিবন্ধিত রয়েছে। কারও কারও ক্ষেত্রে দেখা যায়, অতীতে কোনো সিম ব্যবহার করলেও এখন আর মনে নেই, কিন্তু সেটি এখনো সক্রিয় আছে।
নিজের নামে নিবন্ধিত সব সিম সম্পর্কে জানা থাকলে ভবিষ্যতে কোনো নিয়ম পরিবর্তন হলেও প্রস্তুত থাকা সহজ হয়। পাশাপাশি এতে অবৈধ বা অচেনা সিম ব্যবহারের ঝুঁকিও কমে।
👉 সিম পিন কোড লক হয়ে গেলে করণীয়
নিজের নামে কয়টি সিম আছে তা জানা খুব সহজ। প্রথমে যেকোনো মোবাইল থেকে *16001# ডায়াল করুন। এরপর প্রাপ্ত স্ক্রিনে আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের শেষ চারটি সংখ্যা লিখে “Send” করুন। তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই আপনার এনআইডি-র অধীনে নিবন্ধিত সিমগুলোর তালিকা দেখা যাবে। এই সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং সব অপারেটরের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
গুজব ছড়ালে গ্রাহকদের করণীয়
এই পুরো ঘটনাটি থেকে একটি বড় শিক্ষা পাওয়া যায়। সেটি হলো, সিম, NID বা আর্থিক বিষয়ের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই অফিসিয়াল তথ্য যাচাই করা জরুরি। অপারেটরের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট বা সরকারি ঘোষণাই হওয়া উচিত নির্ভরযোগ্য উৎস।
গুজবের ওপর ভিত্তি করে হঠাৎ সিম বন্ধ করা বা পরিবর্তন আনা পরে সমস্যার কারণ হতে পারে।
ভবিষ্যতে কি সত্যিই সীমা কমতে পারে?
টেলিটকের পোস্টে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত রয়েছেঃ নতুন নির্দেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান নিয়ম বহাল থাকবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে সরকার চাইলে এই সীমা পরিবর্তন করতে পারে। তবে সেটি হলে হঠাৎ করে নয়, বরং নির্দিষ্ট ঘোষণা, সময়সীমা এবং নির্দেশনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে।

২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি হোক বা অন্য কোনো সময়, যদি সত্যিই সিমের সংখ্যা ৫টিতে নামিয়ে আনা হয়, তাহলে সেটি আনুষ্ঠানিকভাবেই জানানো হবে। তাই আগেভাগেই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
শেষ কথা
এক NID-তে কয়টি সিম রাখা যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর নিয়েই মূলত সাম্প্রতিক আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি টেলিটকের ঘোষণা স্পষ্ট করে দিয়েছে, বর্তমানে একটি জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে সর্বোচ্চ ১০টি সিম নিবন্ধন ও ব্যবহার করা যাবে।
যারা গুজব শুনে দুশ্চিন্তায় ছিলেন, তাদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। একই সঙ্গে এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ক্ষেত্রে অফিসিয়াল ঘোষণার ওপর ভরসা করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
- বাংলাটেক ফেসবুক গ্রুপে যোগ দিয়ে প্রযুক্তি বিষয়ক যেকোনো প্রশ্ন করুনঃ এখানে ক্লিক করুন।
- বাংলাটেক ফেসবুক পেইজ লাইক করে সাথে থাকুনঃ এই পেজ ভিজিট করুন।
- বাংলাটেক ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করতে এখানে ক্লিক করুন এবং দারুণ সব ভিডিও দেখুন।
- গুগল নিউজে বাংলাটেক সাইট ফলো করতে এখানে ক্লিক করুন তারপর ফলো করুন।
- বাংলাটেক সাইটে বিজ্ঞাপন দিতে চাইলে যোগাযোগ করুন এই লিংকে।
- প্রযুক্তির সব তথ্য জানতে ভিজিট করুন www.banglatech24.com সাইট।

আমাদের যেকোনো প্রশ্ন করুন!