বাংলাদেশের মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। বাংলালিংক ও স্টারলিংক যৌথভাবে চালু করেছে স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল বা সরাসরি স্যাটেলাইট থেকে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের সেবা। এর মাধ্যমে প্রচলিত মোবাইল টাওয়ারের আওতার বাইরে থাকা এলাকাতেও নির্দিষ্ট ধরনের মোবাইল যোগাযোগ চালু রাখা সম্ভব হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সেবা ব্যবহারের জন্য আলাদা স্টারলিংক ডিশ, স্যাটেলাইট ফোন বা বিশেষ ধরনের মোবাইল ফোন প্রয়োজন নেই। বাংলালিংকের তথ্য অনুযায়ী, ৪জি সমর্থিত মোবাইল ফোন ও বাংলালিংক সিম ব্যবহার করেই এই সেবা নেওয়া যাবে।
তবে এটিকে সরাসরি ‘মোবাইল ফোনে পূর্ণাঙ্গ স্টারলিংক ইন্টারনেট’ বলা ঠিক হবে না। বরং এটি প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের সঙ্গে স্যাটেলাইট যোগাযোগ যুক্ত করে একটি অতিরিক্ত যোগাযোগ স্তর তৈরি করছে। বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব এখানেই।
মূল বিষয়গুলো এক নজরে
- বাংলালিংক বাংলাদেশে স্টারলিংক-ভিত্তিক স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল সেবা চালু করেছে।
- ৪জি ফোন ও বাংলালিংক সিম ব্যবহার করে এই সেবা নেওয়া যাবে।
- আলাদা স্যাটেলাইট ডিশ বা বিশেষ স্যাটেলাইট ফোনের প্রয়োজন নেই।
- মোবাইল টাওয়ারের আওতার বাইরে থাকা সমুদ্র, উপকূল ও দুর্গম এলাকায় যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে।
- প্রাথমিক পর্যায়ে বার্তা আদান-প্রদান, তথ্যভিত্তিক যোগাযোগ ও হোয়াটসঅ্যাপ কলের মতো সেবা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
- প্রথম মাসে নির্দিষ্ট ইন্টারনেট বা মিশ্র প্যাকেজের সঙ্গে স্টারলিংক সংযোগ বিনামূল্যে দেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলালিংক।
- প্রতি মাসে পাঁচটি বিনামূল্যের SMS সুবিধাও রয়েছে।
- দুর্যোগের সময় মোবাইল নেটওয়ার্কের বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে এই প্রযুক্তির গুরুত্ব আরও বেশি হতে পারে।
স্টারলিংক স্যাটেলাইট মোবাইল সেবা আসলে কী?
সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্কে একটি ফোন প্রথমে কাছের মোবাইল টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সেই টাওয়ার আবার ফাইবার, মাইক্রোওয়েভ বা অন্য কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে মোবাইল অপারেটরের মূল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
কোনো এলাকায় টাওয়ার না থাকলে, অথবা টাওয়ারের সঙ্গে সংযোগকারী অবকাঠামো নষ্ট হলে, মোবাইল সেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

🔥🔥 গুগল নিউজে বাংলাটেক সাইট ফলো করতে এখানে ক্লিক করুন তারপর ফলো করুন 🔥🔥
স্টারলিংকের সরাসরি স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল প্রযুক্তি এই জায়গাতেই ভিন্ন। এখানে পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা স্টারলিংক স্যাটেলাইট মোবাইল নেটওয়ার্কের একটি অতিরিক্ত সংযোগকেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে। ফলে উপযুক্ত ৪জি মোবাইল ফোন সরাসরি স্যাটেলাইটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।
অর্থাৎ প্রচলিত ব্যবস্থায় যেখানে কাঠামোটি হলোঃ
মোবাইল ফোন → মোবাইল টাওয়ার → অপারেটরের নেটওয়ার্ক
সেখানে স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল ব্যবস্থায় হতে পারেঃ
মোবাইল ফোন → স্টারলিংক স্যাটেলাইট → স্টারলিংক ও বাংলালিংক নেটওয়ার্ক
এখানে মূল পরিবর্তন হলো, মোবাইল টাওয়ারের বাইরে থাকা ব্যবহারকারীকেও যোগাযোগ নেটওয়ার্কের আওতায় আনার চেষ্টা।
কেন এই প্রযুক্তি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশকে বাইরে থেকে দেখলে ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ মনে হলেও এর ভৌগোলিক বৈচিত্র্য অনেক বেশি।
এখানে রয়েছেঃ
- বিশাল উপকূলীয় অঞ্চল
- সমুদ্র
- চর
- নদীবেষ্টিত এলাকা
- দুর্গম দ্বীপ
- পাহাড়ি অঞ্চল
- প্রত্যন্ত গ্রাম
এসব জায়গায় প্রতিটি অঞ্চলে মোবাইল টাওয়ার স্থাপন করা সবসময় সহজ বা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়।
একটি মোবাইল টাওয়ার স্থাপন করলেই কাজ শেষ হয় না। প্রয়োজন হয় বিদ্যুৎ, টাওয়ার রক্ষণাবেক্ষণ, ফাইবার বা মাইক্রোওয়েভ সংযোগ এবং নিয়মিত কারিগরি সহায়তা।
স্যাটেলাইট যোগাযোগের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এসব স্থলভিত্তিক অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা অনেকাংশে কমানো যায়।
জেলেদের জন্য বড় পরিবর্তন হতে পারে
বাংলাদেশে এই প্রযুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারকারীদের একটি হতে পারেন সমুদ্রে থাকা জেলেরা।
উপকূল থেকে দূরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল টাওয়ারের কাভারেজ কমে যায়। ফলে নৌকায় থাকা মানুষদের সঙ্গে স্থলভাগের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে।
এটি শুধু দৈনন্দিন যোগাযোগের সমস্যা নয়। ঝড়, দুর্ঘটনা বা জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া জীবনহানির ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল প্রযুক্তি সফলভাবে কাজ করলে এই ধরনের এলাকায় সাধারণ মোবাইল ফোন দিয়েই যোগাযোগের একটি অতিরিক্ত পথ তৈরি হবে।
দুর্যোগের সময় সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়া যেতে পারে
বাংলাদেশ নিয়মিত ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়।
একটি বড় দুর্যোগের সময় একই সঙ্গে একাধিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যেমনঃ
বিদ্যুৎ বন্ধ → ফাইবার বিচ্ছিন্ন → মোবাইল টাওয়ার অচল
এই পরিস্থিতিতে প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বা আংশিকভাবে অচল হয়ে যেতে পারে।
স্যাটেলাইট যোগাযোগ তখন একটি অতিরিক্ত যোগাযোগ পথ হিসেবে কাজ করতে পারে।
এখানেই প্রযুক্তিটির সবচেয়ে বড় সামাজিক গুরুত্ব।
স্বাভাবিক সময়ে একজন ব্যবহারকারী হয়তো স্যাটেলাইট যোগাযোগের প্রয়োজন খুব কমই অনুভব করবেন। কিন্তু দুর্যোগের সময় যখন প্রচলিত নেটওয়ার্ক ব্যর্থ, তখন একটি সাধারণ ৪জি ফোন দিয়ে যোগাযোগ চালু রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এটি কি মূলধারার স্টারলিংক ইন্টারনেট?
না। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি।
সাধারণ স্টারলিংক ইন্টারনেটের জন্য সাধারণত একটি স্টারলিংক টার্মিনাল বা ডিশ প্রয়োজন হয়। সেই ব্যবস্থা মূলত বাড়ি, অফিস বা নির্দিষ্ট স্থানে উচ্চগতির ইন্টারনেট দেওয়ার জন্য তৈরি।
বাংলালিংকের নতুন সেবা তার থেকে আলাদা।
এটি সরাসরি মোবাইল ফোনকে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার ব্যবস্থা।
তাই এই সেবাকে ‘ডিশ ছাড়া স্টারলিংক ব্রডব্যান্ড’ বলা বিভ্রান্তিকর হবে।
বরং এটি হলো মোবাইল নেটওয়ার্কের সঙ্গে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের সমন্বয়।
শুরুতে কী কী সেবা পাওয়া যাবে?
প্রাথমিক পর্যায়ে সেবাটির মূল লক্ষ্য পূর্ণাঙ্গ উচ্চগতির ইন্টারনেট দেওয়া নয়।
বাংলালিংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বার্তা আদান-প্রদান, তথ্যভিত্তিক যোগাযোগ এবং হোয়াটসঅ্যাপ কলের মতো সেবা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া প্রয়োজনীয় কিছু অ্যাপ ও লোকেশন সেবা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ের লক্ষ্য হলোঃ
‘সব জায়গায় দ্রুত ইন্টারনেট’ নয়, বরং ‘নেটওয়ার্ক না থাকলেও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ চালু রাখা।’
এই পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলালিংকের জন্য এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের মোবাইল বাজারে গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে নেটওয়ার্ক কাভারেজ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র।
স্টারলিংকের সঙ্গে অংশীদারত্ব বাংলালিংককে একটি নতুন প্রযুক্তিগত সুবিধা দিচ্ছে।
এতদিন একটি মোবাইল অপারেটরের শক্তি মূলত নির্ভর করতঃ
- কত বেশি টাওয়ার আছে
- কত ভালো ফাইবার নেটওয়ার্ক আছে
- কোথায় ৪জি বা ৫জি পাওয়া যায়
- নেটওয়ার্কের গতি কত
এখন এর সঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন যুক্ত হচ্ছেঃ
মোবাইল টাওয়ারের বাইরে গেলে কী হবে?
এই জায়গায় স্যাটেলাইট যোগাযোগ বাংলালিংকের জন্য একটি আলাদা অবস্থান তৈরি করতে পারে।
গ্রামীণফোন ও রবির জন্য এর অর্থ কী?
এটিকে এখনই গ্রামীণফোন বা রবির জন্য সরাসরি হুমকি বলা ঠিক হবে না।
কারণ শহর ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মোবাইল টাওয়ার এখনও অনেক বেশি কার্যকর। একই সঙ্গে অনেক ব্যবহারকারীকে দ্রুতগতির ইন্টারনেট দেওয়ার জন্য স্থলভিত্তিক ৪জি ও ৫জি নেটওয়ার্কের বিকল্প এখনো স্যাটেলাইট নয়।
বরং ভবিষ্যতের মোবাইল নেটওয়ার্ক অনেকটা এমন হতে পারেঃ
মোবাইল টাওয়ার + ফাইবার + ৪জি/৫জি + স্যাটেলাইট
অর্থাৎ স্যাটেলাইট হবে মোবাইল নেটওয়ার্কের বিকল্প নয়, বরং অতিরিক্ত একটি স্তর।
তবে ভবিষ্যতে যদি সরাসরি স্যাটেলাইট থেকে মোবাইল ফোনে উচ্চগতির তথ্য আদান-প্রদান সম্ভব হয়, তাহলে প্রত্যন্ত এলাকার যোগাযোগ বাজারে প্রতিযোগিতার ধরন অবশ্যই বদলাতে পারে।
সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা কোথায়?
প্রযুক্তিটি যতটা আকর্ষণীয়, বাস্তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
আকাশের সঙ্গে যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ
মোবাইল ফোন ও স্যাটেলাইটের মধ্যে যোগাযোগের জন্য আকাশের দিকে তুলনামূলক পরিষ্কার সংযোগ প্রয়োজন।
তাই ভবনের ভেতর, ভূগর্ভস্থ স্থানে বা চারপাশে বড় বাধা থাকা জায়গায় সেবার মান কমে যেতে পারে।
এটি ৪জি বা ৫জির সম্পূর্ণ বিকল্প নয়
স্যাটেলাইটের সক্ষমতা সীমিত। একই সময়ে বিপুল সংখ্যক ব্যবহারকারীকে উচ্চগতির ইন্টারনেট দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থলভিত্তিক মোবাইল নেটওয়ার্ক এখনো অনেক বেশি কার্যকর।
তাই শহরের স্বাভাবিক মোবাইল ইন্টারনেটের বিকল্প হিসেবে এটিকে দেখা উচিত নয়।
প্রাথমিক সেবা সীমিত
বর্তমান সেবার মূল গুরুত্ব বার্তা, প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদান এবং সীমিত যোগাযোগের ওপর।
ভবিষ্যতে তথ্য আদান-প্রদানের সক্ষমতা বাড়তে পারে, কিন্তু সেটিকে বর্তমান সুবিধা হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
বাংলালিংকের বর্তমান অফার
বাংলালিংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম মাসে যেকোনো ইন্টারনেট বা মিশ্র প্যাকেজের সঙ্গে স্টারলিংক সংযোগ বিনামূল্যে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পরবর্তী মাসে নির্বাচিত মাসিক ইন্টারনেট ও মিশ্র প্যাকেজের সঙ্গে অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই স্টারলিংক সংযোগ পাওয়ার সুবিধা রয়েছে।
এ ছাড়া প্রতি মাসে পাঁচটি বিনামূল্যের (SMS) খুদে বার্তার সুবিধার কথাও জানানো হয়েছে।
তবে প্যাকেজ ও বাণিজ্যিক শর্ত পরিবর্তিত হতে পারে। তাই গ্রাহকের নির্দিষ্ট প্যাকেজের বর্তমান শর্ত দেখে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে বড় পরিবর্তনের সংকেত
বাংলালিংক ও স্টারলিংকের এই উদ্যোগকে শুধু একটি নতুন সেবা হিসেবে দেখলে এর বড় দিকটি বাদ পড়ে যায়।
এটি আসলে মোবাইল নেটওয়ার্কের ধারণাকেই বদলাতে শুরু করছে।
এতদিন ‘মোবাইল কাভারেজ’ বলতে বোঝানো হতোঃ
কোথায় মোবাইল টাওয়ার আছে?
ভবিষ্যতে প্রশ্নটি হতে পারেঃ
কোথায় স্থলভিত্তিক নেটওয়ার্ক নেই, কিন্তু স্যাটেলাইট সংযোগ পাওয়া যায়?
এই পরিবর্তন বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ এখানে এমন অনেক এলাকা রয়েছে যেখানে একটি নতুন টাওয়ার স্থাপনের তুলনায় স্যাটেলাইটভিত্তিক সংযোগ অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে।
ভবিষ্যতে কী হতে পারে?
স্টারলিংকের পরিকল্পনায় সরাসরি মোবাইল ফোনে স্যাটেলাইট যোগাযোগের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে বার্তা থেকে তথ্য আদান-প্রদান এবং পরে আরও উন্নত যোগাযোগ সেবার দিকে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশেও যদি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, স্যাটেলাইট কাভারেজ ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদন অনুকূল থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে এই সেবার পরিধি বাড়তে পারে।
তবে দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবেঃ
স্যাটেলাইটের সক্ষমতা কতটা বাড়ানো যায় এবং ব্যবহারকারীরা এর জন্য কতটা অর্থ দিতে আগ্রহী।
এই দুই প্রশ্নের উত্তরই দীর্ঘমেয়াদে সেবাটির ব্যবসায়িক সাফল্য নির্ধারণ করবে।
কী কারণে এই উদ্যোগ ব্যর্থ হতে পারে?
প্রযুক্তি চালু হওয়া আর ব্যাপকভাবে সফল হওয়া এক বিষয় নয়।
প্রথম সমস্যা হতে পারে সক্ষমতা। একই সময়ে অনেক মানুষ স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে চাইলে সেবার মান কমতে পারে।
দ্বিতীয় সমস্যা হতে পারে খরচ। প্রত্যন্ত এলাকায় সেবা দেওয়া প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব হলেও তা সবসময় ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক নাও হতে পারে।
তৃতীয় সমস্যা হলো ব্যবহারকারীর প্রত্যাশা। ‘স্টারলিংক মোবাইলে এসেছে’ শুনে কেউ যদি পূর্ণাঙ্গ উচ্চগতির স্টারলিংক ইন্টারনেট আশা করেন, তাহলে হতাশ হতে পারেন।
কারণ সরাসরি স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল সেবা এবং ডিশভিত্তিক স্টারলিংক ব্রডব্যান্ড এক জিনিস নয়।
বাংলাদেশে কারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন?
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী সম্ভবত শহরের সাধারণ ব্যবহারকারী নন। বরংঃ
- সমুদ্রে থাকা জেলে
- নৌযানের কর্মী
- প্রত্যন্ত দ্বীপের বাসিন্দা
- দুর্গম উপকূলের মানুষ
- পাহাড়ি অঞ্চলের ব্যবহারকারী
- মোবাইল নেটওয়ার্কের দুর্বল এলাকার মানুষ
- দুর্যোগকবলিত এলাকার বাসিন্দা
- জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজন রয়েছে এমন মানুষ
তাদের জন্য এই প্রযুক্তির উপকারিতা অনেক বেশি।
ভবিষ্যৎ: মোবাইল নেটওয়ার্ক কি আকাশেও চলে যাবে?
সম্ভাবনাটি সেদিকেই যাচ্ছে।
ভবিষ্যতের মোবাইল নেটওয়ার্ক শুধু মাটিতে থাকা টাওয়ারের ওপর নির্ভর করবে না। একই ব্যবস্থার মধ্যে থাকবে স্থলভিত্তিক টাওয়ার, ফাইবার নেটওয়ার্ক, ৪জি ও ৫জি এবং স্যাটেলাইট।
ব্যবহারকারী কোথায় রয়েছেন এবং কোন নেটওয়ার্ক তখন সবচেয়ে ভালো কাজ করছে—তার ওপর ভিত্তি করে সংযোগের ধরন বদলে যেতে পারে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে গতি নয়, বরং নেটওয়ার্কের স্থায়িত্ব ও নির্ভরযোগ্যতা।
FAQ – প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
বাংলালিংক স্টারলিংক ব্যবহার করতে কি ডিশ লাগবে?
না। বাংলালিংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৪জি সমর্থিত ফোন ও বাংলালিংক সিম ব্যবহার করেই সেবা নেওয়া যাবে।
এটি কি সাধারণ স্টারলিংক ইন্টারনেট?
না। এটি সরাসরি স্যাটেলাইট থেকে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের সেবা। সাধারণ স্টারলিংক ব্রডব্যান্ডের মতো আলাদা ডিশভিত্তিক সংযোগ এটি নয়।
কী ধরনের ফোন প্রয়োজন?
৪জি সমর্থিত মোবাইল ফোন প্রয়োজন। তবে নির্দিষ্ট সেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ফোন ও নেটওয়ার্কের সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ।
কী কী ব্যবহার করা যাবে?
প্রাথমিক পর্যায়ে বার্তা আদান-প্রদান, তথ্যভিত্তিক যোগাযোগ এবং হোয়াটসঅ্যাপ কলের মতো সেবা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। বাংলালিংকের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষায় WhatsApp, IMO, Viber ও Signal-এ টেক্সট, ভয়েস কল ও ফাইল পাঠানো গেছে। তবে স্যাটেলাইটের অবস্থার কারণে কলের মান সবসময় একরকম নাও থাকতে পারে, কখনো কল নাও সফল হতে পারে।
প্রথম মাসে খরচ কত?
বাংলালিংক জানিয়েছে, প্রথম মাসে নির্দিষ্ট ইন্টারনেট বা মিশ্র প্যাকেজের সঙ্গে স্টারলিংক সংযোগ বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে।
প্রতি মাসে কতটি বিনামূল্যের খুদে বার্তা বা SMS পাওয়া যাবে?
প্রতি মাসে পাঁচটি বিনামূল্যের খুদে বার্তার সুবিধা দেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলালিংক।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা কী?
দুর্গম এলাকা, সমুদ্র এবং দুর্যোগের সময় প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে থেকেও যোগাযোগের একটি অতিরিক্ত পথ তৈরি করা।
উপসংহার
বাংলালিংক ও স্টারলিংকের এই উদ্যোগকে শুধু নতুন একটি মোবাইল প্যাকেজ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না।
এর বড় পরিবর্তন হলো, বাংলাদেশে মোবাইল যোগাযোগ ধীরে ধীরে মোবাইল টাওয়ারের ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করছে।
তবে স্টারলিংক সরাসরি ৪জি বা ৫জির বিকল্প হয়ে যাচ্ছে—এমন ধারণা এখনই সঠিক নয়। আগামী কয়েক বছরেও স্থলভিত্তিক মোবাইল নেটওয়ার্কই থাকবে মূল যোগাযোগ অবকাঠামো।
স্টারলিংক বরং সেই নেটওয়ার্কের ফাঁক পূরণ করতে পারে।
বিশেষ করে সমুদ্র, দ্বীপ, দুর্গম অঞ্চল এবং দুর্যোগের সময় এর গুরুত্ব অনেক বেশি হতে পারে।
তাই এই প্রযুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ‘কত দ্রুত ইন্টারনেট পাওয়া যাবে?’ নয়।
প্রশ্নটি হলোঃ
যেদিন মোবাইল টাওয়ার কাজ করবে না, সেদিনও কি একটি সাধারণ মোবাইল ফোন যোগাযোগ করতে পারবে?
বাংলালিংক–স্টারলিংকের উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্কের ভবিষ্যতের উত্তর হতে পারে—”হ্যাঁ”।
- বাংলাটেক ফেসবুক গ্রুপে যোগ দিয়ে প্রযুক্তি বিষয়ক যেকোনো প্রশ্ন করুনঃ এখানে ক্লিক করুন।
- বাংলাটেক ফেসবুক পেইজ লাইক করে সাথে থাকুনঃ এই পেজ ভিজিট করুন।
- বাংলাটেক ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করতে এখানে ক্লিক করুন এবং দারুণ সব ভিডিও দেখুন।
- গুগল নিউজে বাংলাটেক সাইট ফলো করতে এখানে ক্লিক করুন তারপর ফলো করুন।
- বাংলাটেক সাইটে বিজ্ঞাপন দিতে চাইলে যোগাযোগ করুন এই লিংকে।
- প্রযুক্তির সব তথ্য জানতে ভিজিট করুন www.banglatech24.com সাইট।




আমাদের যেকোনো প্রশ্ন করুন!