কক্সবাজার ঘুরে এলাম

বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বহু আগেই ভূত হয়ে গেছে। এই ভূত সেই ভূত না, যা দেখে আপনি ভয় পেয়ে যাবেন। এখানে ভূত বলতে ‘ভবিষ্যতের বিপরীত’ অর্থাৎ ‘অতীত’ বোঝানো হয়েছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স সাহেবের নামেই বর্তমান কক্সবাজারের নামকরণ। কক্সবাজারে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুময় সমুদ্র সৈকত যা দেখার জন্য অসংখ্য দেশি-বিদেশি পর্যটক প্রতিনিয়ত ভিড় জমাচ্ছেন চট্টগ্রাম শহর থেকে ১৫২ কিলোমিটার দক্ষিণের এই পর্যটন এলাকায়।

গত ৩-৬ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারে একটা চমৎকার ট্যুর উপভোগ করে এলাম। এখানে সেই ভ্রমণের কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি।

ওয়েব অ্যাপ ও ওয়েব ডিজাইনে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় একটি কোম্পানি জুমশেপার এর টিম মেম্বার হওয়ার সুবাদে প্রতি বছর একটি প্রমোদ ভ্রমণের সুযোগ পেয়ে থাকি। এবারের গন্তব্য ছিল কক্সবাজার। বিজনেস ক্লাসের পুরো একটি বাস ভাড়া করে আমরা ২৪ জন ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখ রাতে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। পরের দিন সকালে সমুদ্র সৈকতের একদম কাছে বিলাসবহুল সীগাল হোটেলে চেক-ইন করি টিমের সবাই।

কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর সকালের নাস্তার জন্য বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের পুরো টিমকে একত্রে সকালের নাস্তা সার্ভ করতে পারবে, এরকম রেস্টুরেন্ট পেতে বেশ কিছুটা পথ হাঁটতে হয়েছে। সঙ্গত কারণেই সমুদ্র সৈকতের কাছাকাছি রাস্তাঘাটে প্রচুর বালু। এখানে ভালোভাবে পথ চলার জন্য বুট/কেডস এর জুড়ি নেই।

নাস্তার পর শুরু হল আমাদের মূল কার্যক্রম। সমুদ্র সৈকতে গিয়ে সাগরের সৌন্দর্য উপভোগ। সেখানে ফুটবল খেলা হল। সমুদ্রের জলে ও স্থলে উভয় স্থানেই ফুটবল খেলল টিম জুমশেপার। আমি অবশ্য দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিলাম।

‘সূর্যের চেয়ে বালি গরম’ প্রবাদটির যথার্থতা পরীক্ষা করার জন্য সমুদ্র সৈকতে হাঁটার বিকল্প নেই।

দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত সুইমিং পুলে লাফঝাঁপ। মূল পুলের পানি বেশ ঠাণ্ডা। পাশেই আরেকটি গোলাকার ছোট্ট পুল আছে যাকে বলে ‘জ্যাকুইজি’, সেটাতে উষ্ণ পানির প্রবাহ রয়েছে।

প্রথম দিন বিকেলে ঘুড়ি ওড়ানো ও অতঃপর সূর্যাস্ত দেখা ছিল আমাদের অন্যতম কাজ। সন্ধ্যায় হালকা কেনাকাটা ও চ-কফি খেয়ে হোটেলে ফিরে এসে রাতের বার-বি-কিউ পার্টির জন্য প্রস্তুত সবাই।

বার-বি-কিউতে ছিল মুরগী, মাছ, নান, সালাদ, কোল্ড ড্রিংক্স প্রভৃতি। ট্যুরের বিশাল খানাপিনা উৎসবে এটা ছিল নমুনামাত্র।

আমি রাত ১২টার দিকেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, তবে টিমের অনেকেই রাতে আরেকদফা সী-বিচে গিয়ে গানবাজনায় মেতেছিলেন।

ট্যুরের দ্বিতীয় দিন (৫ ফেব্রুয়ারি) শুরু হল বুফে নাস্তার সাথে। সীগাল হোটেলের বোর্ডারদের রুমপ্রতি একটি কুপন দেয়া হয়। যতদিনের জন্য রুম ভাড়া নেয়া হয় ততটি কুপন। সেই কুপন জমা দিয়ে সকালে বুফে (আনলিমিটেড) নাস্তা খাওয়া যায়। এখানে পরোটা, সব্জি, ডিম, মাংস থেকে শুরু করে রুটি, মাখন, বিরিয়ানি, ডেজার্ট, চা, কফি সহ আর ডজনের অধিক আইটেম অফার করা হয়। সকালে বুফে নাস্তার পর দুপুরে খাওয়ার কথা অনেকেই ভুলে যান।

বিকেলে আমাদের গন্তব্য ছিল ইনানী সী-বিচ। কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে ইনানী যাওয়ার পথে আমরা দরিয়ানগরে থেমেছিলাম। সেখানে প্যারাসেইলিং নামক চমকপ্রদ এক অভিজ্ঞতা নেয়া যায়। ঘুড়ির মত আকাশে উড়ে সমুদ্র দর্শন। ৪৫০-৫০০ ফুট লম্বা একটা দড়ির একপ্রান্ত একটা স্পিডবোটের সাথে বাঁধা থাকে।

দড়ির অপর প্রান্তে বিশাল এক প্যারাস্যুটের সাথে একজন মানুষকে বেল্ট দিয়ে আটকে দেয়া হয়। এরপর স্পিডবোট চালু করলে প্যারাস্যুট উপরের দিকে উঠে যায়। প্যারাস্যুটে থাকা মানুষটি প্রায় ৫০০ ফুট উপর থেকে সাগর দেখার সুযোগ পান। কেউ কেউ এখানে সেলফি স্টিক নিয়েও ওঠেন!

৫ মিনিটের মত আকাশে ভেসে থাকার পর আবারও মাটির বুকে ফিরে আসেন প্যারাসেইলিং যাত্রী।

ইনানী বিচে যাওয়ার জন্য আমরা ‘চান্দের গাড়ি’ প্রচলিত নামের বিশেষ এক প্রকার ট্যুরিস্ট জিপে চড়েছিলাম। ইনানী যাওয়ার পথে ডানদিকে সাগরের হালকা সবুজ ও নীলাভ জলরাশি এবং বামদিকে সবুজ পাহাড়ের অপূর্ব দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে হা হয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।

ইনানী থেকে ফেরার পথে আমরা মারমেইড বিচ রিসোর্টে রাতের খাবার খাই। এখানে থাকাখাওয়ার অদ্ভুত ব্যবস্থা আছে। ছোট ছোট কুঁড়েঘরে নতুন কাপলদের জন্য অভিনব সব আয়োজন। মারমেইডে খাওয়ার সময় সরাসরি সাগর দেখা যায়। এদের রান্নাবান্না ভাল। ঘটনাক্রমে আমাদের ভাগ্যে ঝাল বেশি পড়ে গিয়েছিল। পরে অবশ্য চিনি দিয়ে সেই ঝালকে প্রশমিত করার চেষ্টা ছিল মারমেইড কর্তৃপক্ষের।

খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি মারমেইড বিচ রিসোর্টে আমরা ক্যাম্প ফায়ার উপভোগ করি।

দুই হাতে আগুন নিয়ে চমৎকার এক কসরত দেখালেন মারমেইডের একজন অ্যাথলেট। মারমেইড থেকে ফিরতে ফিরতে রাত ১১টা বেজে যায়। এরপর হোটেলে এসে আবারও সমুদ্র দর্শন। সেই সাথে বিচ-সংগীত।

ট্যুরের শেষ দিন (৬ ফেব্রুয়ারি) আমাদের মহেশখালী যাওয়ার প্রোগ্রাম ছিল। কক্সবাজার শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মহেশখালী হচ্ছে বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ী দ্বীপ।

যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে রাত হয়। এই প্রবাদের যথোপযুক্ত ব্যবহার টের পেয়েছি মহেশখালী যাওয়ার সময়। স্পিড বোটে মহেশখালী যেতে আমাদের ১৫-১৮ মিনিটের মত সময় লাগার কথা ছিল। কিন্তু মেশিনে ত্রুটি দেখা দেয়ায় কমপক্ষে ১৫ মিনিট থেমে ছিল স্পিড বোট। শুধু স্থির হয়ে থাকলে কোনো কথা ছিলনা। পাশ দিয়ে অন্য বোট গেলে সেই ঢেউয়ে আমাদের বোট দুলে উঠছিল। সে এক ভীতিকর অভিজ্ঞতা। তাও ভাগ্য ভালো যে সাগরে ঢোকার আগে স্পিড বোটে ত্রুটি দেখা দিয়েছিল!

মহেশখালী পা রেখে মনে হল এ এক অন্য পৃথিবী। ঘন কেওড়া গাছের সারি ঘাটেই আপনাকে স্বাগত জানাবে।

সেখান থেকে অটোরিক্সায় পুরো এলাকা ঘুরে আসা যাবে। এখানে দর্শনীয় স্থানের মধ্যে মন্দির, পাহাড়, লবণ মাঠ, শুঁটকি মহাল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। আমরা অনেকগুলো দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখলাম।

প্রথমে মনে হয়েছিল এটা নির্জন দ্বীপ। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল মহেশখালীতে রয়েছে পুরো ব্যস্ত ও প্রতিষ্ঠিত একটি জনপদ। তারপরও এভাবে বিচ্ছিন্ন একটা জনপদ কীভাবে থাকে তা অনুভব করে কেমন যেন লাগছিল। এখান থেকে বের হতে হলে সমুদ্র পারি দিতে হয় যা অনেক সময় ভীতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ। পরে জানতে পারলাম বদরখালী ব্রীজ নির্মাণের ফলে মহেশখালী দেশের মুল ভূখন্ডের সাথে সরাসরি যুক্ত হয়েছে। সড়কপথে বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে মহেশখালীতে যাতায়াত সম্ভব। মহেশখালীতে আমরা বিখ্যাত মিষ্টি পান খেলাম।

মহেশখালী থেকে ফিরে কক্সবাজারের রান্নাঘর রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেয়ে যে যার মত কিছু শপিং করে আবার হোটেলে ফিরে এসে ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিই। রাত ৮টায় আমাদের বাস ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। পথে ফোর সিজনস রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খাই। সকাল ৮টা নাগাদ ভালোভাবে সবাই ঢাকায় পৌঁছাই। সেই সাথে সম্পন্ন হয়ে যায় জুমশেপার বার্ষিক ভ্রমণ।

এই পুরো ট্যুরের খরচ বহন করেছেন জুমশেপার প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও কাওসার আহমেদ ভাই। তাঁকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমার জানা নেই।

সর্বশেষ প্রযুক্তি বিষয়ক তথ্য সরাসরি আপনার ইমেইলে পেতে ফ্রি সাবস্ক্রাইব করুন!

Join 4,256 other subscribers

Comments