MVNO সিমের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জানালো বিটিসিএল

বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে বহুল প্রতীক্ষিত একটি উদ্যোগ ছিল বিটিসিএল-এর এমভিএনও সিম চালু করা। দীর্ঘ প্রস্তুতি, কারিগরি পরীক্ষা এবং সম্ভাব্য বাজারজাতকরণের তারিখ ঘোষণা, সব মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে গ্রাহক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। তবে হঠাৎ করেই নতুন এক প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে পরীক্ষামূলক চালুর কার্যক্রম স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড বা বিটিসিএল।

এর ফলে এমভিএনও সেবা কবে নাগাদ বাজারে আসবে তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বিটিসিএল সূত্র জানায়, তাদের এমভিএনও সিমের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবার প্রভিশনিং সংক্রান্ত কল টেস্ট সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এতে ভয়েস কল, ডাটা কল, আলাপ-টু-মোবাইল, আলাপ-টু-আলাপ এবং GPON ইন্টিগ্রেশনসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেবার পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এই ঘোষণা প্রযুক্তি মহলে ইতিবাচক সাড়া ফেলে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরেই বিটিসিএল ব্রডব্যান্ড ও অপটিক্যাল ফাইবার অবকাঠামো নিয়ে কাজ করলেও মোবাইল নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রতিযোগিতায় ছিল না। এমভিএনও সিম চালু হলে তারা নতুনভাবে মোবাইল বাজারে প্রবেশ করতে পারত।

এরপর আরেক প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সিম উন্মুক্তকরণের সম্ভাব্য তারিখ পরিকল্পনা করে রাখা হলেও অনিবার্য কারণে চূড়ান্ত বাজারজাতকরণের তারিখ ১ মার্চ ২০২৬ নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, শুরুতেই এক দফা তারিখ পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছিল।

sim cards on hand

🔥🔥 গুগল নিউজে বাংলাটেক সাইট ফলো করতে এখানে ক্লিক করুন তারপর ফলো করুন 🔥🔥

নতুন ঘোষণা: পরীক্ষামূলক চালু স্থগিত

কিন্তু আজকের (২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) নতুন প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে বিটিসিএল জানায়, এমভিএনও সেবা পরীক্ষামূলকভাবে চালুর কার্যক্রম অনিবার্য কারণবশত স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি জানানো হয়েছে, বাজারজাতকরণের বিষয়ে সম্মানিত গ্রাহকদের পরবর্তীতে অবহিত করা হবে।

এই ঘোষণায় নির্দিষ্ট কোনো নতুন তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ১ মার্চেও সেবা চালু হচ্ছে না, এটা এখন নিশ্চিত।

টেলিকম বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণত এই ধরনের প্রকল্পে প্রযুক্তিগত ইন্টিগ্রেশন, লাইসেন্সিং, বাণিজ্যিক চুক্তি, সরকারি সিদ্ধান্ত, অথবা নেটওয়ার্ক শেয়ারিং সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিতে পারে। যদিও বিটিসিএল তাদের বিজ্ঞপ্তিতে স্থগিতের নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেনি।

এমভিএনও কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ

এমভিএনও বা মোবাইল ভার্চুয়াল নেটওয়ার্ক অপারেটর হলো এমন একটি টেলিকম সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, যাদের নিজস্ব রেডিও নেটওয়ার্ক অবকাঠামো থাকে না। তারা বিদ্যমান মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নিজেদের ব্র্যান্ডে সেবা প্রদান করে।

বাংলাদেশে বর্তমানে গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক এবং টেলিটকের মতো অপারেটররা সরাসরি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। বিটিসিএল এমভিএনও হিসেবে এলে তারা মূলত বিদ্যমান কোনো মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্ক ভাড়া নিয়ে নিজেদের সিম বাজারে আনত।

এই মডেল বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়। ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশে এমভিএনও গ্রাহকদের জন্য কম খরচে বিশেষায়িত প্যাকেজ নিয়ে আসে। বাংলাদেশেও যদি এটি সফলভাবে চালু হতো, তাহলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ত এবং গ্রাহকরা বিকল্প সুবিধা পেতে পারতেন।

👉 এক NID-তে কয়টি সিম? সুখবর দিলো টেলিটক

GPON ইন্টিগ্রেশন: ব্রডব্যান্ড ও মোবাইলের সমন্বয়

বিটিসিএল ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে অপটিক্যাল ফাইবারভিত্তিক ব্রডব্যান্ড সেবা দিয়ে থাকে। বিশেষ করে GPON প্রযুক্তির মাধ্যমে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান তাদের অন্যতম শক্তি।

প্রথম প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে GPON ইন্টিগ্রেশনের উল্লেখ ছিল, যা ইঙ্গিত দেয়, ভবিষ্যতে বিটিসিএল ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল সেবাকে একত্রিত করে বান্ডেল অফার দিতে পারে। অর্থাৎ, একই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে হোম ইন্টারনেট ও মোবাইল সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারত।

এটি বাস্তবায়িত হলে কর্পোরেট ও হোম ইউজারদের জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি হতে পারত। তবে বর্তমান স্থগিতাদেশ সেই সম্ভাবনাকে আপাতত থামিয়ে দিয়েছে।

গ্রাহকদের জন্য এর অর্থ কী

যারা বিটিসিএল এমভিএনও সিমের অপেক্ষায় ছিলেন, তাদের আপাতত আরও অপেক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে যারা ভেবেছিলেন ১ মার্চ থেকে নতুন অফার পাওয়া যাবে, তাদের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হতে পারে।

তবে একটি বিষয় ইতিবাচক, বিটিসিএল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্প বাতিল করার কথা বলেনি। বরং “পরবর্তীতে অবহিত করা হবে” বলে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ, মনে হচ্ছে প্রকল্প পুরোপুরি বন্ধ নয়; বরং সময়সীমা অনির্দিষ্টভাবে পিছিয়েছে।

বাংলাদেশের টেলিকম বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব

বাংলাদেশের মোবাইল বাজার ইতোমধ্যে বেশ প্রতিযোগিতাপূর্ণ। নতুন কোনো প্লেয়ার এলে সাধারণত মূল্য ও প্যাকেজে প্রতিযোগিতা বাড়ে। বিটিসিএল এমভিএনও হিসেবে এলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর সুবিধা কাজে লাগাতে পারত।

বিশেষ করে সরকারি কর্মচারী, শিক্ষার্থী বা নির্দিষ্ট সেগমেন্টের জন্য কাস্টমাইজড প্যাকেজ আনা সম্ভব ছিল। ব্রডব্যান্ড গ্রাহকদের জন্য মোবাইল বান্ডেল অফারও একটি বড় আকর্ষণ হতে পারত। বর্তমান স্থগিতাদেশে সেই সম্ভাবনা আপাতত স্থবির হয়ে গেছে।

👉 সিম পিন কোড লক হয়ে গেলে করণীয়

সামনে কী হতে পারে?

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কবে নাগাদ এমভিএনও সেবা চালু হতে পারে? বিটিসিএল নতুন কোনো তারিখ ঘোষণা না করা পর্যন্ত নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না।

তবে যেহেতু কল টেস্ট সফল হওয়ার কথা আগেই জানানো হয়েছিল, তাই ধরে নেওয়া যায় প্রকল্পের একটি বড় অংশ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি যে জটিলতাই থাকুক, তা সমাধান হলেই হয়তো নতুন তারিখ ঘোষণা আসবে।

গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ওপর নির্ভর করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনানুষ্ঠানিক সূত্রের তথ্যের বদলে বিটিসিএল-এর প্রেসবিজ্ঞপ্তির দিকেই নজর রাখা উচিত।

শেষ কথা

বিটিসিএল-এর এমভিএনও সিম নিয়ে শুরু থেকেই আগ্রহ ছিল ব্যাপক। সফল কল টেস্ট, নির্ধারিত বাজারজাতকরণের তারিখ, সব মিলিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সর্বশেষ ঘোষণায় পরীক্ষামূলক চালু স্থগিত হওয়ায় সেই প্রত্যাশায় সাময়িক বিরতি পড়েছে।

তবে প্রকল্প বাতিল হওয়ার কোনো ঘোষণা এখনও আসেনি- এটাই আপাতত স্বস্তির বিষয়। এখন অপেক্ষা কবে নতুন তারিখ ঘোষণা আসে এবং বিটিসিএল কবে আনুষ্ঠানিকভাবে এমভিএনও সেবা চালু করে। বাংলাদেশের টেলিকম খাতের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে পারে। তাই পরবর্তী ঘোষণার দিকে নজর থাকছে সবারই।

📌 পোস্টটি শেয়ার করুন! 🔥

সর্বশেষ প্রযুক্তি বিষয়ক তথ্য সরাসরি আপনার ইমেইলে পেতে ফ্রি সাবস্ক্রাইব করুন!

Join 8,345 other subscribers

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *