সচল হলো প্রথম বিটিসিএল MVNO সিম

দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক যুক্ত হলো। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বিটিসিএল পরিচালিত MVNO সিম সফলভাবে সচল হয়েছে। ভয়েস কল, ডাটা কল, আলাপ টু মোবাইল নেটওয়ার্ক, আলাপ টু আলাপ এবং জিপন ইন্টিগ্রেশন – এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টের প্রভিশনিং সম্পন্ন হয়েছে এবং কল টেস্টও সফলভাবে শেষ হয়েছে। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।

এই অর্জন শুধু একটি প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, বরং রাষ্ট্রীয় টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোকে আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার পথে একটি বড় পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন ধরে মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের বাইরে থেকেও কীভাবে উদ্ভাবনী সেবা দেওয়া যায়, সে আলোচনার বাস্তব রূপ হিসেবেই এমভিএনও (MVNO) উদ্যোগটিকে দেখা হচ্ছে।

যা জানালেন ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব

৩ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এই অগ্রগতির কথা জানান। তিনি লেখেন, দেশের প্রথম বিটিসিএল MVNO সিমটি ইতোমধ্যে সচল হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সব ধরনের টেস্ট সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এটি কোনো কাগুজে ঘোষণা নয়; বরং বাস্তব প্রভিশনিং, অ্যাক্টিভেশন ও লাইভ কল টেস্টের মধ্য দিয়েই এই অগ্রগতি নিশ্চিত করা হয়েছে।

এই ঘোষণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ প্রথমবারের মতো নিশ্চিত বার্তা পেল যে, রাষ্ট্রীয় টেলিযোগাযোগ সংস্থাও এখন আধুনিক মোবাইল ভার্চুয়াল নেটওয়ার্কের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব নিজেই জানান, তিনি আজ দুপুরে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড এর গুলিস্তান ও রমনা কার্যালয়ে উপস্থিত থেকে প্রভিশনিং, অ্যাক্টিভেশন এবং টেস্ট কল পর্যবেক্ষণ করেছেন। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক, কারণ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে সরাসরি মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করলে প্রকল্পের গতি ও মান দুটোই বাড়ে।

MVNO কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

MVNO বা মোবাইল ভার্চুয়াল নেটওয়ার্ক অপারেটর এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে নিজস্ব রেডিও স্পেকট্রাম না থাকলেও অন্য অপারেটরের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গ্রাহকদের মোবাইল সেবা দেওয়া যায়। আন্তর্জাতিকভাবে এটি খুবই জনপ্রিয় একটি মডেল, কারণ এতে নতুন সেবাদাতা কম খরচে বাজারে প্রবেশ করতে পারে এবং গ্রাহকরাও পায় প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ও নতুন সেবা।

btcl mvno sim demo

🔥🔥 গুগল নিউজে বাংলাটেক সাইট ফলো করতে এখানে ক্লিক করুন তারপর ফলো করুন 🔥🔥

বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা বিশাল এবং ডাটা ব্যবহারের হার দ্রুত বাড়ছে, সেখানে MVNO চালু হওয়া মানে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যাওয়া। বিটিসিএলের MVNO উদ্যোগ সফল হলে রাষ্ট্রীয় সংস্থার মাধ্যমে তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও সেবামুখী মোবাইল প্যাকেজ পাওয়ার আশা করছেন অনেকেই।

ভয়েস ও ডাটা কলের সফল টেস্টের তাৎপর্য

ভয়েস কল ও ডাটা কল, এই দুইটি সেবা হলো যেকোনো মোবাইল নেটওয়ার্কের ভিত্তি। বিটিসিএল MVNO সিমে এই দুটি সেবার সফল প্রভিশনিং এবং টেস্ট কল সম্পন্ন হওয়া মানে প্রযুক্তিগতভাবে নেটওয়ার্ক প্রস্তুত। পাশাপাশি আলাপ টু মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং আলাপ টু আলাপ কল সফল হওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, অন্যান্য অপারেটরের সঙ্গে ইন্টারকানেকশনও ঠিকভাবে কাজ করছে।

জিপন ইন্টিগ্রেশন সম্পন্ন হওয়া আরও একটি বড় অগ্রগতি। জিপন প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত ও স্থিতিশীল ডাটা সেবা দেওয়া সম্ভব, যা ভবিষ্যতে ফাইবার-ভিত্তিক মোবাইল ব্যাকহল এবং ট্রিপল প্লে সেবার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৮ তারিখে লাইভ পাইলট শুরুর প্রত্যাশা

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, আগামী ৮ তারিখে বিটিসিএল MVNO’র লাইভ পাইলট শুরু হবে। লাইভ পাইলট মানে সীমিত পরিসরে বাস্তব গ্রাহকের মাধ্যমে সেবা চালু করে সব ধরনের পারফরম্যান্স, কল কোয়ালিটি, ডাটা স্পিড ও কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স যাচাই করা।

এই ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হলে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক সেবা চালুর পথ অনেকটাই পরিষ্কার হবে। সাধারণত লাইভ পাইলটের মাধ্যমে নেটওয়ার্কের দুর্বলতা, বিলিং সমস্যা বা গ্রাহক সাপোর্ট সংক্রান্ত বিষয়গুলো চিহ্নিত করা হয়।

MVNO-এর সঙ্গে ট্রিপল প্লে: একসাথে চালুর পরিকল্পনা

সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, বিটিসিএল শুধু MVNO নয়, একইসাথে ট্রিপল প্লে সেবা চালুর পরিকল্পনাও করছে। ট্রিপল প্লে বলতে বোঝায় ভয়েস, ডাটা ও টিভি – এই তিনটি সেবা একসাথে দেওয়া। বিটিসিএলের বিদ্যমান ফাইবার নেটওয়ার্ক এবং আইপিটিভি সক্ষমতা বিবেচনায় নিলে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

যদি MVNO ও ট্রিপল প্লে একসাথে চালু হয়, তাহলে গ্রাহকরা একটি মাত্র সংযোগ বা প্যাকেজের মাধ্যমে মোবাইল, ইন্টারনেট ও টিভি সেবা নিতে পারবেন। এটি শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

👉 বিটিসিএল আনবে নতুন মোবাইল সিম, থাকছে যেসব সুবিধা

রাষ্ট্রীয় টেলিযোগাযোগে নতুন গতি

বহু বছর ধরে বিটিসিএলকে অনেকেই কেবল ল্যান্ডফোন ও সীমিত ব্রডব্যান্ড সেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ভাবতেন। কিন্তু MVNO ও ট্রিপল প্লে উদ্যোগ দেখাচ্ছে, সংস্থাটি নতুন করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাচ্ছে। সরকারি মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি শুধু ব্যবসায়িক নয়, বরং কৌশলগত গুরুত্বও বহন করে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্য বাস্তবায়নে শক্তিশালী টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো অপরিহার্য। সেই প্রেক্ষাপটে বিটিসিএলের এই অগ্রগতি নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যেও আশার সঞ্চার করছে।

সামনে কী দেখছেন বিশেষজ্ঞরা

টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিটিসিএল MVNO সফল হলে বাজারে স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা বাড়বে। একইসাথে সরকারি পর্যায়ে ডাটা সিকিউরিটি ও নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাও বাড়বে। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। গ্রাহক সেবা, আধুনিক প্যাকেজিং, দ্রুত সমস্যা সমাধান এবং নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করতে না পারলে প্রত্যাশা পূরণ কঠিন হবে।

তবুও সাম্প্রতিক এই সফল টেস্ট ও লাইভ পাইলটের ঘোষণা প্রমাণ করে, প্রস্তুতির দিক থেকে বিটিসিএল অনেকটাই এগিয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে, দেশের প্রথম BTCL MVNO সিম সচল হওয়া বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা। এখন দেখার বিষয়, লাইভ পাইলট শেষে এটি কীভাবে বাণিজ্যিকভাবে সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছায় এবং MVNO ও ট্রিপল প্লে একসাথে চালু হলে গ্রাহক অভিজ্ঞতায় কী ধরনের পরিবর্তন আসে।

📌 পোস্টটি শেয়ার করুন! 🔥

সর্বশেষ প্রযুক্তি বিষয়ক তথ্য সরাসরি আপনার ইমেইলে পেতে ফ্রি সাবস্ক্রাইব করুন!

Join 8,339 other subscribers

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *