ফ্রিল্যান্সারের ডায়েরিঃ “মিষ্টি মিষ্টি হাসিতে, দাওয়াত দিলাম আসিতে”

By -

eid-mubarakঈদ মোবারক। ২০১৩ সালের শেষ প্রান্তে এসে বিশ্ব যখন ফোর’জি-ফাইভ’জি নিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে তখন বাংলাদেশে কেবল থ্রিজি উঁকি দিচ্ছে। নেটওয়ার্ক ও স্পিডের অবস্থা নাইবা বললাম। কিন্তু তাই বলে আমরাও যে একেবারে এনালগ রয়ে গেছি তাও কিন্তু না! জোড়াতালি দেওয়া টু’জি নেটওয়ার্কের যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও আমরা ভালই ডিজিটাল হয়ে গেছি।

প্রাইমারীতে পড়ার সময় ঈদ মৌসুম এলেই স্টেশনারী দোকানগুলোতে ‘ঈদ কার্ড’এর বিশাল কালেকশান চোখে পড়ত। একই দোকানে এত বছর পরেও কার্ড ঠিকই বিক্রি হয়- কিন্তু সেগুলো মূলত মোবাইলের স্ক্র্যাচ কার্ড। ঈদ কার্ড দেয়ার মত ‘এনালগ’ মানুষের পরিমাণ অনেক কমে গেছে।

সর্বশেষ প্রযুক্তি বিষয়ক তথ্য সরাসরি আপনার ইমেইলে পেতে ফ্রি সাবস্ক্রাইব করুন!

Join 1,359 other subscribers

ঐ যে বললাম, আমরাও এখন ডিজিটাল, হোক সে ৪-৫ কিলোবাইট/সেকেন্ড ইন্টারনেট স্পিড!

অস্বীকার করার উপায় নেই, আধুনিক প্রযুক্তিতে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সুবিধা অনেক। হবেইনা বা কেন? আপনি যদি আমাদের টু’জি পুর্ববর্তী (বা এর সমসাময়িক) যুগ পেয়ে থাকেন তবে নিশ্চয়ই এ সঙ্ক্রান্ত অভিজ্ঞতা আছে। উদাহরণস্বরূপ, একটা ঈদ কার্ড মাত্র একজনকেই উপহার দেয়া যায়। পৌঁছানোর সময়, খরচ সেসব বিবেচনা করলে পার্থক্যটা আরও স্পষ্ট হবে।

আর এখনকার ডিজিটাল যুগ দেখুন, একই এসএমএস/এমএমএস কপি পেস্ট করে অসংখ্য মানুষকে “ঈদ মোবারক” বলার ঘটনা অহরহ চোখে পাড়বে!

আপনার বন্ধু মহলের মধ্যে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়কালে আপনারই লেখা মেসেজ একাধিক বন্ধুর কাছ থেকে তাদের নিজ নিজ নামসহ রিসিভ করলে মোটেই অবাক হবেন না! হতে পারে আপনি “X”কে এসএমএস দিয়েছেন, সে আবার সেটা এডিট করে নিজনামে “Y”কে ফরওয়ার্ড করেছে! এদিকে “Y”ও আপনার “বজম ফ্রেন্ড”, সে “X” এর কাছ থেকে পাওয়া দারুণ সেই মেসেজটি আবার আপনাকেই পাঠিয়ে দিল! এটাকে “এসএমএস এর দুষ্টুচক্র” বললে ভুল হওয়ার কথা না।

কিন্তু কাগুজে ঈদ কার্ড কপি-পেস্ট করা সম্ভব না। তাই এর সাথে জড়িয়ে থাকা আবেগ, ভালোবাসা, স্মৃতিও কখনো হারায়না।

ক্লাস ফোরে একবার স্কুল পরিবর্তন করেছিলাম। আমরা নলছিটিতে শিফট করায় সেখানকার একটা প্রাইমারী স্কুলে (নলছিটি বন্দর সঃ প্রাঃ বিদ্যালয়) ভর্তি হই। নতুন স্কুল, নতুন লোকজন, নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে খুব একটা সময় লাগেনি। আমাদের বাসার পাশে আরেকটা ছেলে আমার ক্লাসমেট ছিল। ওর নাম “মিরন”; লেখাপড়ার চেয়ে খেলাধুলাতেই তার আগ্রহ বেশি ছিল। স্কুলে যাওয়া-আসা, সকালে মসজিদে আরবী শেখা সহ ক্রিকেট খেলা, ঘুড়ি উড়ানো, ঝিঁঝিঁ পোকা ধরা ইত্যাকার নানান কাজ (?!?) আমরা একত্রেই করতাম। ছোট্ট শহর নলছিটির মোটামুটি সব জায়গাই ওর চেনা ছিল। ঘোরপ্যাঁচ মিলিয়ে বাসা থেকে স্কুলে যেতে মিরন বিভিন্ন সময় কমপক্ষে ডজনখানেক আলাদা আলাদা পথ অনুসরণ করত, যা আমার কাছে একটু বিরক্তিকরই লাগত। একটু অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় কিনা! এই স্বভাবের জন্য সে টিচারের হাতের মারও কম খায়নি…… আজ থাক সেসব কথা।

নলছিটির ঐ স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম জানুয়ারির পরে কোন এক মাসে। তখন স্বাভাবিকভাবেই আমার  আমার রোল নাম্বারের সিরিয়াল সবার শেষে গিয়েছিল। খুব সম্ভবত ৩৫-৩৬ হবে। ক্লাসের ফার্স্ট বয় ছিল “হাসিব”; প্রথম ক্লাসে সবার আগে গোলগাল চেহারার এই ছেলেটার সাথেই কথা হয়। যতদূর মনে পড়ে, হাসিবের আব্বু ওখানকার কলেজের ফিজিক্স টিচার ছিলেন। তাঁর একটা স্টেশনারীও ছিল। একটু লম্বা-চুলওয়ালা এই ভদ্রলোকের কাছে একবার ব্যবকরণ বই কিনতে গিয়েছিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন “কোন বই নেবে”; আমার কাছে বুক লিস্ট না থাকায় প্রকাশনীর নাম বলতে পারিনি। শুধু বললাম “হাসিবের যে বই আমারও একই বই দরকার”; তিনি একটু হেসে আমাদের সিলেবাস অনুযায়ী বই দিয়ে দিলেন।

নলছিটিতে দিন ভালই যাচ্ছিল। আমাদের ক্লাসে একটা মোটা মেয়ে ছিল। মাঝখানে একদিন স্কুলে না যাওয়ায় আমার পাশের বেঞ্চের আরেকটি মেয়ে “নাতাশা”র কাছ থেকে পড়া জেনে নিচ্ছিলাম। মোটা মেয়েটা ফিস ফিস করে বলল “এই নাতাশা বলিস না বলিস না”! অবশ্য মটু’র পরামর্শ কোন কাজে লাগেনি 😛

একবার কী একটা ব্যাপারে হাসিবের সাথে মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছিল। আমাদের সবারই কিছু কিছু দোষ ছিল। কিন্তু দুই/এক দিনের মধ্যেই আবার সবকিছু ঠিক হয়ে যায়। ছোটবেলা থেকেই, কেউ আমার উপর রাগ করে বা ভুল বুঝে থাকলে আমার খুব কষ্ট লাগে… তো, এক সকালে ক্লাস শুরুর আগে হাসিব বলল, “আমরা এখন থেকে ফ্রেন্ড, ঠিক আছে?”; আমি বললাম “আচ্ছা”; সাথে আরও কয়েকজন ছিল… সম্ভবত “ইমতিয়াজ, সবুজ…”

ঐ সময় সামনেই কুরবানীর ছুটি ছিল। ঈদের আগে ঐদিনই আমাদের শেষ ক্লাস হয়। সেদিন ওদের সাথে অনেক গল্পসল্প হল। পরের দিন ঈদ উপলক্ষ্যে গ্রামের বাড়ীতে আসার জন্য গোছগাছ করতে গিয়ে বইয়ের মধ্যে সাদা একটা খাম আবিষ্কার করলাম। খাম খুলে একটা “ঈদ কার্ড” পেলাম। মিনার, চাঁদ, তারা, ফুল এজাতীয় ছবির সাথে কার্ডটির ভেতরের পাতায় হাতেলেখা একটা ছন্দও ছিল। কার্ডে লেখা ছিল-

“ মিষ্টি মিষ্টি হাসিতে,

            দাওয়াত দিলাম আসিতে

                                                         —হাসিব”

ওর হাতের লেখা আমার থেকে ভাল ছিল। বড় বড় অক্ষরে লেখা এই লাইনদুটো এখনও মনে আছে।

ঈদের পর আমি আর নলছিটিতে ফিরে যাইনি। আব্বুর কর্মস্থল পরিবর্তন ও আরও কিছু কারণে ১০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে বহুল স্মৃতি বিজড়িত সেই স্কুলে আর যাওয়া হয়নি। ঐ ঈদ কার্ডটা অনেকদিন আমার কাছে ছিল। কিন্তু কীভাবে যেন একসময় সেটাও হারিয়ে গেছে।

অনেক দিন পরে, আমার ভার্সিটির এক ছোটভাইয়ের সূত্রে জেনেছিলাম হাসিব সম্ভবত ঢাকা ইউনিভার্সিটির সিএসই’তে পড়েছিল। কিন্তু তার কোন “কন্টাক্ট ইনফরমেশন” পাইনি।

নলছিটির সহপাঠী, বন্ধুদের এখনও মনে পড়ে। তাদের ক্ষেত্রেও কি এমন হয়?

হয়ত হয়, হয়ত না… যাইহোক, সবাই ভাল থাকুক সেটাই কাম্য।

“ফ্রিল্যান্সারের ডায়েরি” সিরিজের এই পোস্টটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। ত্যাগের মহিমায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠুক আপনাদের জীবন। ঈদ মোবারক।

প্রযুক্তির সব তথ্য জানতে ভিজিট করুন www.banglatech24.com সাইট। নতুন পোস্টের নোটিফিকেশন ইমেইলে পেতে এই লিংকে গিয়ে ফ্রি সাবস্ক্রাইব করুন!

 

Comments

Leave a Reply