শাওমি স্মার্টফোন নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা

By -

চীনা ইলেকট্রনিকস কোম্পানি শাওমি (Xiaomi) ‘চীনের অ্যাপল’ নামে পরিচিত। বিশ্বজুড়ে অ্যাপল যেমন জনপ্রিয় একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, তেমনি চীনেও শাওমি অ্যাপলের মত জনপ্রিয়। বাংলাদেশেও শাওমি’র স্মার্টফোন পাওয়া যায়। তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে শাওমি ফোনে বেশ আকর্ষণীয় ফিচার দেয়া হয়। কিন্তু শাওমি স্মার্টফোন আসলে কেমন?

সর্বশেষ প্রযুক্তি বিষয়ক তথ্য সরাসরি আপনার ইমেইলে পেতে ফ্রি সাবস্ক্রাইব করুন!

Join 1,113 other subscribers

একটা কোম্পানি অনেকগুলো ডিভাইস তৈরি করে। একজনের পক্ষে সবগুলো ব্যবহার করা সম্ভব নয়। অনলাইনে আমরা যে রিভিউগুলো দেখি, তাতে সাধারণত কয়েক ঘন্টা/কয়েক দিন ব্যবহার করেই একটা রিভিউ লিখে দেয়া হয়। কিন্তু এই অল্প সময়ে একটা ডিভাইসের রিভিউ করলে তার অনেক কিছুই অগোচরে থেকে যায়।

আমি প্রায় ৩ মাস ধরে শাওমি রেডমি নোট ৩ এন্ড্রয়েড স্মার্টফোন ব্যবহার করে আসছি। এটি ব্যবহার করে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তা আপনাদের সাথে শেয়ার করছি এই পোস্টে।

 

শাওমি রেডমি নোট ৩ ফোনে রয়েছেঃ

  • ৫.৫ ইঞ্চি ১০৮০পি ফুল এইচডি ডিসপ্লে
  • ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর (০.৩ সেকেন্ডে আনলক হয়)
  • ১৩ মেগাপিক্সেল ব্যাক ক্যামেরা, ৫ মেগাপিক্সেল ফ্রন্ট ক্যামেরা
  • ৪০০০ এমএএইচ ব্যাটারি
  • হেলিও এক্স১০ মিডিয়াটেক ফ্ল্যাগশিপ প্রসেসর
  • ১৬জিবি স্টোরেজের ভার্সনে ২জিবি র‍্যাম, ৩২জিবি স্টোরেজের ভার্সনে ৩জিবি র‍্যাম
  • ডুয়াল সিম, উভয় সিমেই ফোরজি সাপোর্ট
  • মেটাল বডি, ১৬৪ গ্রাম ওজন
  • এন্ড্রয়েড ৫ ললিপপ ভিত্তিক এমআইইউআই ৭ অপারেটিং সিস্টেম

আমার শাওমি রেডমি নোট ৩ তে আছে ৩জিবি র‍্যাম ও ৩২জিবি স্টোরেজ। এবার ফোনটি সম্পর্কে আমার কিছু অভিজ্ঞতা লিখছি।

 

বাহ্যিক গঠন ও কেসিং

শাওমি রেডমি নোট ৩’তে আছে মেটাল বডি। ফোনটি প্রথমবার দেখে ও হাতে নিয়ে আপনার ভালো না লাগার কোনো কারণ নেই। এটি সোনালী, রুপালি ও কালো রঙের কেসিংয়ে পাওয়া যায়। বিল্ড কোয়ালিটি নিয়ে আমার আপাতত কোনো অভিযোগ নেই।

 

সেন্সর

ফোনটিতে স্ট্যান্ডার্ড বেশিরভাগ সেন্সরই আছে। ডিভাইসটির পেছনে ক্যামেরার ঠিক নিচে বাড়তি পাবেন ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর। অর্থাৎ আঙুলের ছাপের সাহায্যে আপনি ফোনটি আনলক করতে পারবেন। সেন্সরটি এক সেকেন্ডের তিন ভাগের একভাগ সময়ের মধ্যেই ফোন আনলক করতে পারে। এখন পর্যন্ত ফিঙ্গারপ্রিন্ট ভালোই কাজ করছে। এটা নিয়েও আমার কোনো অভিযোগ নেই।

 

ক্যামেরা

এই ফোনটি চালানোর আগে আমি ৮ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা সমৃদ্ধ একটি নকিয়া ও একটি স্যামসাং ফোন চালিয়েছি। এই তিনটি ফোনের মধ্যে নকিয়ার ক্যামেরাটিই আমার কাছে সবচেয়ে ভাল লেগেছে। স্যামসাংও ভালো। তবে শাওমি রেডমি নোট ৩ এর ক্যামেরাটা আমার কাছে অ্যাভারেজ লেগেছে। এর ১৩ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা আমার কাছে স্পেশাল কিছু মনে হয়নি। তবে কাজ চলে যাচ্ছে। এই ক্যামেরা নিয়ে আমি অখুশীও না আবার খুশীতে গদগদও না। জাস্ট গোয়িং। অবশ্য ফ্রন্ট ক্যামেরাটা বেশ ভাল।

 

স্ক্রিন

Screenshot_2016-01-31-11-35-19_com.miui.home

শাওমি রেডমি নোট ৩ ফোনের যে অংশটা আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে তা হচ্ছে এর ডিসপ্লে। ৫.৫ ইঞ্চি সাইজের চমৎকার এই স্ক্রিনটি যে কারো প্রথম দেখায় পছন্দ হবে।

Screenshot_2016-02-26-12-42-52_com.miui.home

স্ক্রিনটির অত্যন্ত টাচ সেনসিটিভ, দ্রুত কাজ করে। ব্রাইটনেস, কনট্রাস্ট সবকিছুই এক কথায় অসাধারণ লেগেছে।

 

নেটওয়ার্ক

নেটওয়ার্ক নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনো সমস্যা পাইনি। ভালোই মনে হচ্ছে।

 

অডিও ও মিউজিক

রেডমি নোট থ্রি ফোনের সাথে কোনো ইয়ারফোন দেয়নি শাওমি। এটা খুবই অবাক করার মত একটা ব্যাপার। আজকাল ১ হাজার টাকা দামের ফোনের সাথেও অডিও এক্সেসরি (ইয়ারফোন) দেয়া হয়। যেহেতু কমদামে স্মার্টফোন বানাতে পারে, তাই এর সাথে অন্তত অ্যাভারেজ কোয়ালিটির একটা হেডফোন দিতে পারত শাওমি। এই ফোনটিতে কল কোয়ালিটি ও মিউজিকের মান ভালোই। যদিও আমার মিউজিক শোনা হয়না, তবে রিংটোনের শব্দের মান শুনলেই ধারণা করা যায় এতে ভাল রেকর্ডের অডিও ও ভিডিও ফাইলের সাউন্ড ভালই হবে। এফএম রেডিও ইয়ারফোন ছাড়াই চলে, শব্দের মান চমৎকার। শাওমির পিস্টন ব্র্যান্ডের কিছু ইয়ারফোন/হেডফোন পাওয়া যায় যেগুলোর দাম ৭০০ থেকে ১০০০+ টাকার মত। সেগুলো কিনলে অডিও বেশ ভালভাবেই উপভোগ করা যাবে এতে।

 

ব্যাটারি

শাওমি রেডমি নোট ৩ ফোনের ব্যাটারি ব্যাকআপ অসাধারণ। ব্যাটারি নিয়েও আমার কোনো অভিযোগ নেই। সারাক্ষণ ডেটা অন রাখা ও তিন-চার ঘন্টা ব্রাউজিং করলেও একদিন হেসে খেলে চলে যাবে। ফোনটির চার্জারের সাহায্যে ব্যাটারি চার্জ ফুল হতে দেড় থেকে দুই ঘন্টা সময় লাগে।

 

অপারেটিং সিস্টেম

শাওমি রেডমি নোট ৩ স্মার্টফোনে এন্ড্রয়েড ৫.০ ললিপপ অপারেটিং সিস্টেম ভিত্তিক শাওমির নিজস্ব এমআইইউআই ব্যবহৃত হয়েছে। এর ইউজার ইন্টারফেস চমৎকার। ডিজাইন নিয়ে আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট।

Screenshot_2016-01-31-11-36-37_com.miui.home

কিন্তু সফটওয়্যারটির বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে যা ফোনটির আকর্ষণ কমিয়ে দিতে যথেষ্ট।

 

জটিলতাঃ MIUI এর মধ্যে শাওমির নিজস্ব সিক্যুরিটি অ্যাপ রয়েছে। সেই অ্যাপের মাধ্যমে আপনি যদি নির্দিষ্ট কিছু অ্যাপকে ‘অটো স্টার্ট’ পারমিশন না দেন, তবে সেসব অ্যাপ ঠিকঠাক কাজ করবেনা। এটা নিরাপত্তার জন্য হলেও বড় ধরণের সমস্যার কারণও বটে। উদাহরণস্বরূপ, জিমেইল অ্যাপকে আপনি যদি অটো স্টার্ট পারমিশন না দেন, তাহলে ফোন চালুর পর নতুন ইমেইল এলে এটি তা সিনক্রোনাইজ করবেনা। ফলে আপনি নিজ থেকে জিমেইল অ্যাপ ওপেন করার আগে পর্যন্ত নতুন ইমেইল আসার খবর জানতেই পারবেন না। স্যামসাং এন্ড্রয়েড ফোনে এই ধরণের পলিসি নেই। আমি স্যামসাং ফোনে জিমেইল সহ এ ধরণের অন্যান্য অ্যাপ স্বাভাবিকভাবেই ব্যবহার করেছি।

 

শাওমি ক্লাউডঃ শাওমির বিভিন্ন রকম সার্ভিস আছে যা দেখে অবাক হয়েছি। এমআই ক্লাউডে ফোনবুক সিনক্রোনাইজ করে রাখা যায়। এর ৫ জিবি ফ্রি ক্লাউড স্টোরেজে ছবি, ভিডিও প্রভৃতি রাখতে পারবেন। এগুলো ভালোই লেগেছে।

 

MIUI এর আরও উন্নয়ন দরকার

শাওমির সফটওয়্যার টিম MIUI এর বেশ কিছু সমস্যার গভীরে যায়নি বলেই মনে হয়। আমি ফোনটি কেনার পর বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। এরপর MIUI সফটওয়্যার আপডেট পেয়ে সেগুলো ইনস্টল করে বেশ কিছু সমস্যার সমাধানও পেয়েছি। এগুলো মারাত্নক সমস্যা ছিল।

ব্লুটুথ সমস্যাঃ ফোনটির ব্লুটুথ কিছু কিছু অ্যাপের সাথে কনফ্লিক্ট করে। যেমন ধরুন, গুগল ফটো অ্যাপ থেকে ব্লুটুথের সাহায্যে কোনো ফাইল সেন্ড করতে গেলে কিছুক্ষণ পর ব্লুটুথ সার্ভিস এরর আসে। ফোনটির ডিফল্ট ফটো অ্যাপের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি হয়না।

নেটওয়ার্ক সার্ভিস এররঃ রেডমি নোট ৩ ফোনে প্রথম প্রথম প্রায়ই নেটওয়ার্ক সার্ভিস এরর মেসেজ আসত। পরে ফোনের সফটওয়্যার আপডেটের সাহায্যে এটি দূর হয়। এরকমভাবে ক্যামেরাও হ্যাং করত যা আপডেটের মাধ্যমে দূর হয়।

পিসি স্যুট অ্যাপঃ নকিয়া পিসি স্যুট/অভি স্যুট/নকিয়া স্যুট সফটওয়্যারের কথা মনে আছে? সেই সফটওয়্যারগুলো কম্পিউটারে ইনস্টল করে নকিয়া ফোনের ডেটা সিঙ্ক্রোনাইজ, ব্যাকআপ ও সফটওয়্যার আপডেট প্রভৃতি করা যেত। শাওমি’রও এমআই পিসি স্যুট নামে একই ধরণের একটা সফটওয়্যার আছে। কিন্তু এটা ঠিকঠাক কাজ করেনা। আমি এটা দিয়ে ফোনের ব্যাকআপ নিতে গেলে বলে সফটওয়্যার আপডেট করতে। আর সফটওয়্যার আপডেট করতে গেলে এনক্রিপশনের কারণে আর আপডেট হয়না। শুরুতে একবার আপডেট থাকা অবস্থায় ব্যাকআপ নিতে গেলে সেবার বিনা নোটিশেই ব্যাকআপ ফেইল করে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এনক্রিপশনের মত জরুরী ও অ্যাডভান্সড ফিচার শাওমি ঠিক হ্যান্ডেল করতে পারছেনা। তবে একটা কথা বলতেই হচ্ছে, শাওমি পিসি স্যুট সফটওয়্যারটি স্যামসাংয়ের পিসি স্যুট {কাইস/কাইস৩ (Kays, Kays3)} এর চেয়ে অনেক বেশি ফিচার রিচ ও ভালো ইউআই সমৃদ্ধ। যদিও নকিয়া এখন আর মার্কেটে নেই, তবে নকিয়া স্যুট উল্লিখিত উভয়ের চেয়েই সব দিক দিয়ে ভাল ছিল।

 

এনক্রিপশন ত্রুটি

শাওমি রেডমি নোট ৩ ফোনটি সম্বন্ধে আমার সবচেয়ে বেশি হতাশাজনক লেগেছে যে বিষয়টি নিয়ে তা হল এর এনক্রিপশন। প্রথম ১ মাসেরও বেশি সময় ধরে আমি এই ফোনের ফুল ডিভাইস এনক্রিপশন ফিচারটি চালুই করতে পারিনি। সফটওয়্যারের বাগের কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। পরে এমআইইউআই আপডেট করার পর এনক্রিপশন সম্ভব হয়।

Screenshot_2016-01-21-10-04-13

কিন্তু তারপরেই আরও বড় সমস্যা দেখা দেয়। ফুল ডিভাইস এনক্রিপশন করার পর সেই এনক্রিপশন আর ক্যান্সেল করা সম্ভব হয়না। এটার জন্য অবশ্যও গুগলের পলিসিও দায়ী। এন্ড্রয়েড ৫ এ এনক্রিপশন চালু করার পর সেটি সরাসরি আর ডিক্রিপ্ট করা যায়না। ফোন ফ্যাক্টরি রিসেট করে এনক্রিপশন বন্ধ করতে হয়।

রেডমি নোট ৩ এনক্রিপ্ট করার পর ফোনটি আর সফটওয়্যার আপডেট নেয়না। সফটওয়্যার আপডেট করার সময় ফোন রিস্টার্ট নেয়ার সময় সবকিছু ভুলে আবার নরমাল মুডে চলে যায়। এখন না পারছি এনক্রিপশন বন্ধ করতে, না পারছি সেট ফরম্যাট দিতে। কারণ এর বুটলোডারও লক করা- সুতরাং এটি রুট করাও আপাতদৃষ্টিতে সম্ভব না। এখন শাওমির কাছে অনলাইনে অ্যাপ্লিকেশন করে বুটলোডার আনলক করে তারপর সেট ফ্ল্যাশ করে এনক্রিপশন খুলতে হবে। এরপর নতুন করে এমআইইউআই সেটআপ করে তারপর ওএস আপডেট করতে হবে। এ এক বিশাল ঝামেলার কাজ।

ওদিকে এনক্রিপ্টেড MIUI 7.1.6 ভার্সনে ফোনের ম্যাগনেটিক সেন্সর ঠিকভাবে কাজ করেনা। সুতরাং এটা আপডেট না করলে সমস্যা থাকবেই।

 

উপসংহার

সব মিলিয়ে শাওমি স্মার্টফোনের বেশ কিছু বিষয় আমার ভাল লাগলেও এর সফটওয়্যারের সমস্যার কারণে ফোনটির পুরো সুবিধা নেয়া সম্ভব হচ্ছেনা। বেশ স্লিম ও সুন্দর এই ফোনটি বাজারে ছাড়ার আগে শাওমির উচিত ছিল এর ফিচারগুলো ঠিকঠাক কাজ করে কিনা তা পরীক্ষা করা।

আপনি কি শাওমি ফোন ব্যবহার করেন বা করেছেন? আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?

Comments

Leave a Reply